-->

বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কে অপার সম্ভাবনা

শুধু সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপ কিংবা বেসামরিক খাত নয়, সামরিক খাতেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সফরের মাধ্যমে ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের দ্বার উন্মোচিত হয়। সেসময় বাংলাদেশের বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সৌদি সরকার ১ কোটি ডলার সহায়তা প্রদান করে। পরবর্তীতে সম্পর্কোন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে সৌদি সরকার। এক‌ই বছর তারা সর্বপ্রথম ২১৭ জন শ্রমিক নেয় এবং ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সর্বাধিক শ্রমিক আমদানি করে।
.

বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কে অপার সম্ভাবনা

.
প্রাচীনকাল থেকেই এ দুই অঞ্চলের মাঝে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সুফি সাধকদের পাশাপাশি আরবীয় বণিকদের অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের অন্যতম বাণিজ্যিক রুট ছিল বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যে যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দরে যাত্রাবিরতি ঘটতো এদের। বিভিন্ন কারণে অত্র অঞ্চলে অবস্থানকালে আরবীয় বণিকদের এখানকার মায়ায় পড়ে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। এসব কারণে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে আরবীয় সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। 
.
.
দ্বিপাক্ষিক সম্পৃতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল। তৎকালীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের অর্থায়নে মক্কা-মদিনায় গড়ে উঠেছিল বহু স্থাপনা। এসবের মধ্যে অন্যতম হলো, মাদরাসা, সরাইখানা, আরাফাতের ময়দানের খাল। এছাড়া তৎকালীন সময়ে নিয়মিত অর্থ সাহায্য প্রদানের কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হলেও পবিত্র হজ পালন ও বাণিজ্যিক লেনদেনের ফলে আদিকাল থেকেই দুই অঞ্চলের সম্পর্ক সুদৃঢ়। কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের চতুর্থ জনবহুল মুসলিম দেশ।
শেখ হাসিনা ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠক
শেখ হাসিনা ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠক

বিগত ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৪৫ বছরপূর্তি অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে দু'দেশের সম্পর্কে দৃঢ়তা, নির্ভরযোগ্যতা ও সৌহার্দ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রতিনিয়ত। স্বাধীনতা উত্তর সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৭৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকা বাংলাদেশের তেলের চাহিদা পূরণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সৌদি আরব। তারা সহজ শর্তে ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে বাংলাদেশে। সর্বশেষ গত ১৬ নভেম্বর বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ বাংলাদেশকে ১৫ লক্ষ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উপহার দেয় দেশটি।
.

সৌদি আরবকে তেল নির্ভরতা থেকে বের করতে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান(এমবিএস) ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নে কাজ করছেন। এ লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন ইতোমধ্যে। বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে গত বছরের জুলাইয়ে একটি আইন সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় স্পন্সর ছাড়াই বিদেশিরা সেখানে ব্যবসা করতে পারবে। অন্যদিকে সমৃদ্ধ টেকসই অর্থনীতি গড়তে তারা বিভিন্ন দেশে লাভজনক বিনিয়োগেও আগ্রহী। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক
বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক

বাংলাদেশ পৃথিবীর অষ্টম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ। স্বল্ল মূল্যে শ্রম, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বন্দর সুবিধাসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশকে করে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম বিনিয়োগ বান্ধব অঞ্চল। গত বছরের নভেম্বরে বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশ ১১টি খাতকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছে। এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন সৌদি পরিবহন মন্ত্রীও। উল্লেখ্য, তখন মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরও পরিদর্শন করেন তিনি।

.
১১ টি খাতের মধ্যে পরিবহন, যোগাযোগ ও চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে আগ্রহ প্রকাশ করে সৌদি আরব। পরের মাসে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১৬ মার্চ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসছেন। এ সফরের মূল লক্ষ্য সৌদি 'বৃহৎ' বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই। সফরে পূর্ব নির্ধারিত সম্ভাব্য স্বাক্ষরিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ-সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক
বাংলাদেশ-সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

২০১৬ থেকে ২০১৯ সালব্যাপী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন সফর সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এরই একটি উদাহরণ হল ২০০৮ সালে আরোপিত বাংলাদেশি শ্রমিক গমনে সৌদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এই ক্রমবিকাশমান সম্পর্ককে সফলভাবে কাজে লাগাতে আসন্ন সফরের উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এটি বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিরীক্ষণমূলক একটি সফর। তাই আমাদের সম্ভাবনাগুলো যথার্থভাবে তুলে ধরতে হবে তাদের সামনে। এসময় বাংলাদেশে আরব ব্যবসায়ীদের কাঙ্ক্ষিত 'সৌদি অর্থনৈতিক অঞ্চল' প্রতিষ্ঠায় সরকারি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সঠিকভাবে তুলে ধরার কোন বিকল্প নেই।
.
.
শুধু সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপ কিংবা বেসামরিক খাত নয়, সামরিক খাতেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ-সৌদি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই ব্যাটালিয়নের প্রায় ১৮০০ সদস্য নিয়ে যায় সৌদি আরব। সেনাবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা যাবে। তাছাড়া সৌদি আরবের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সামরিক চৌকস ডাক্তাররাও সৌদি‌ চিকিৎসা খাতে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে তারা নিজেরাও উন্নত প্রশিক্ষণ লাভ করতে পারবে। আয়ত্ত করতে পারবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কৌশল

.
প্রযুক্তিগত দক্ষতায়ও বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়াররা যথেষ্ট প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নেপালে ব্যাংকিংসহ অন্যান্য খাতের 'ডিজিটাল মেন্টেইনেন্স সিস্টেম' সরবরাহ করেছে। ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নে সৌদি আরবে বিভিন্ন খাতে বিপুল দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদা পূরণে গত বছরের নভেম্বরে প্রযুক্তি, চিকিৎসা, আইন, বিজ্ঞান, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক খাতে উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব প্রদানের ঘোষণা দেয় সৌদি সরকার।
.
.
সুতরাং চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে যথার্থতার সহিত বাংলাদেশকে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সর্বাধিক কার্যকরি করে গড়ে তুলতে হবে। এ অগ্রযাত্রায় আসন্ন সৌদি সফরটি হতে পারে উভয়ের জন্য যুগান্তকারী মাইলফলক। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট ও ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক মন্দা মোকাবেলায় সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.