-->
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারে ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারে ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন

ANALYSING THE WORLD
ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হয় আজ থেকে প্রায় একশো বছর পূর্বে। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সৌদি প্রজাতন্ত্র শুরু থেকেই পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট। বিপরীতে ইরানের সাথে রয়েছে তাদের দোদুল্যমান সম্পর্কের ইতিহাস। ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরান পশ্চিম ও তার মিত্রদের কাছে আস্থাভাজন ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারে ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন


বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরানের সার্বিক খাতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। পূর্বের বন্ধুরাষ্ট্র ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরিণত হয় শত্রুরাষ্ট্রে। শিয়া শ্রেষ্ঠত্ববাদী নীতির ফলে সৌদির সাথেও টানাপোড়েন শুরু হয়। এরপর থেকে দূরত্ব বাড়তে থাকে। দশকব্যাপী চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধ শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব গভীর করে আরও। তবে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন ইরানের জন্য শাপে বর হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতায় ইরাকি প্রশাসনে ইরানের ব্যাপক প্রভাব বিস্তার ঘটে। বলা যায়, এতে ইরাক সৌদির হাত থেকে বেরিয়ে যায় অনেকটা।
.
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারে ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারে ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন

সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস

বিগত এক যুগে সম্পর্কের তিক্ততা ব্যাপক আকার ধারণ করে। সাম্প্রদায়িক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইরান-সৌদি প্র্রতিযোগিতা চরমে পৌঁছে। সাবেক রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ একে "নতুন স্নায়ুযুদ্ধ" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
.
.
এ যুদ্ধ প্রকট হয় ২০১১ সালে। তখন আরব বসন্তকে কেন্দ্র করে ইরান ও সৌদি আরব আধিপত্য বিস্তারের খেলায় নামে। এসময় সৌদির পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তারা সমর্থনপুষ্টদের আর্থিক ও রাজনৈতিকের পাশাপাশি সরাসরি সামরিক সাহায্যও দেয়া শুরু করে। এর প্রমাণ মেলে লেবাননে সৌদি ট্যাংকের অংশগ্রহণ এবং ইয়েমেনে সৌদি জোটের বোমা হামলায়। ইরানও সমর্থনপুষ্ট মিলিশিয়া বাহীনি সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। তাদের মাধ্যমেই বর্তমানে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনে ইরান যথেষ্ট শক্তিশালী। আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় সৌদি অনেকটা পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ে। এর মাঝে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সৌদি জোটের ঘুম হারাম করে দেয়। এ নিয়ে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর পারমাণবিক চুক্তি, ইরানের সর্ব‌োচ্চ্য ধর্মীয় নেতার সাথে ওবামার গোপন চিঠি আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলে ইরানের ভূমিকাকে স্বীকার করে নিয়েছে। এতে উদ্বেগ বাড়ে সৌদি আরবের।
.
ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়নে উদ্বেগ
ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়নে উদ্বেগ

.
সর্বশেষ ২০১৬ সালে সৌদিতে শিয়া ধর্মগুরুর ফাঁসিকে কেন্দ্র করে উভয় দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতি টানে। এরপর ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের গুরুত্ব কমে যায়। ইরানকে দমনে উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার আওতায় ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে উদ্বুদ্ধ হয়। ফলে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো অনায়াসেই ইরান-ইসরায়েল প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
.

সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগ

এতকিছুর পরেও পুনরায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে গত বছর থেকে ইরান ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক মহলে কর্মচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। বিগত এক বছরে এ পর্যন্ত পাঁচের অধিক দ্বিপাক্ষিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্ধযুগ পর জেদ্দায় অবস্থিত ওআইসির ইরানি প্রতিনিধি অফিস পুনরায় চালু করেছে ইরানি কূটনীতিকরা। অপরদিকে সৌদি আরবও ইরান সমর্থিত সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাশার আসাদকে আরব লিগে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। এক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রশংসনীয় ভুমিকা রাখছে ইরাক।
.
ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন
ইরান-সৌদি সম্পর্কোন্নয়ন

.
দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ এর আগেও বিভিন্ন সময় নেয়া হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ ২০০৭ সালে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) প্রথম বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। যদিও সংগঠনটি ১৯৮০ সালে ইরানের বিপ্লবী উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রতিহত করার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইরানি প্রেসিডেন্টের এই সফর সম্পর্কের সম্ভাব্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। উক্ত বৈঠকের পরপরই আহমদিনেজাদকে মক্কায় বার্ষিক হজে অংশ নিতে সৌদি আরবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু সম্পর্ক উন্নয়নের এই প্রয়াস বেশি দিন স্থায়ী হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের কারসাজিতে।
.

সম্পর্কোন্নয়নে উভয় দেশের স্বার্থ

আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে নেয়া সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোয় উভয়ের সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্বার্থের হিসেবে সম্পর্ক উন্নয়নে দু'দেশই লাভবান হবে বৈকি।
.

সৌদি আরবের বাধ্যবাধকতা

সৌদি আরবের ছয় দশকের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পাল্টেছে সম্প্রতি। সৌদির সুরক্ষায় প্রদেয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ইয়েমেন হামলা, জামাল খাসোগি হত্যাও সৌদি-মার্কিন সম্পর্কে দাগ কেটেছে। এর জেরে চলমান জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে মার্কিন ও তার মিত্ররা যে অনুরোধ জানিয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছে সৌদি আরব। এমতাবস্থায় সৌদির অভ্যন্তরে ইরান সমর্থনপুষ্টদের হামলা বেড়েছে। ২০২০সালে সৌদির সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগারে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা বাদশাহ সালমানকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
.

সতর্ক অবস্থানে ইরান-সৌদি আরব
সতর্ক অবস্থানে ইরান-সৌদি আরব
.
বর্তমানে তেল নির্ভরতা কাটিয়ে শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটন ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নে কাজ করছে সৌদি সরকার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত না হলে পরিকল্পিত সার্বিক কর্মযজ্ঞ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অনুধাবন করে যে, ভিশন বাস্তবায়নে বৃহৎ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ইরানের সাথে ডি-এস্কেলেশনের বিকল্প নেই।
.
.
সৌদি আরবের তেলভিত্তিক অর্থনীতি প্রধানত হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালীর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে ইরানি নৌবাহিনী। ইরান উক্ত প্রণালীতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করলে একমাত্র খোলা পথ হবে বাব আল-মান্দেব প্রণালী। এটি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় থাকা সৌদির সর্ববৃহৎ তেল ক্রেতাদের নিকট তেল রপ্তানি সম্ভব। প্রণালীটি অবস্থিত ইয়েমেনের উপকূল ঘেঁষে, যার অধিকাংশই বর্তমানে ইরান সমর্থিত হুথিরা নিয়ন্ত্রণ করে।
.
.

ইরানের স্বার্থ

অন্যদিকে ইরান মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপের মুখে বিশ্ববাণিজ্যে অনেকটাই কোণঠাসা। সৌদির সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটলে ব্যবসা, বিনিয়োগসহ নানাদিকে উপকৃত হবে ইরানের অর্থনীতি। সৌদি আরব দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য শুরু করলে মার্কিন অবরোধ কাটিয়ে উঠা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে ইরানের জন্যে। এছাড়া ইরানি অস্ত্রের বাজার‌ও তৈরি হতে পারে আরব উপদ্বীপ জুড়ে।
.
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সৌদি সম্পর্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সৌদি সম্পর্ক

সম্পর্কোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা

চলমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কল্যাণজনক হলেও অনেকের জন্যই চিন্তার কারণ বটে। দু'দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র বিক্রি হ্রাস পেতে পারে। কেননা তখন যুদ্ধাবস্থা ও নিরাপত্তা হুমকি অনেকটাই কমে আসবে। অপরদিকে ইসরায়েল কখনো চাইবে না দীর্ঘদিনের দুই শত্রু বন্ধুতে রুপান্তরিত হোক। এতে যেকোন সময় আরব দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। হ্রাস পেতে পারে আরব দেশগুলোর ইসরায়েল নির্ভরশীলতা।
.
.
তবে কূটনীতিতে সবসময় সবকিছুর উর্ধ্বে নিজ দেশের স্বার্থই বিবেচ্য।‌ ইরান এবং সৌদি আরব নিজ নিজ দেশের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি চাইলে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কোন বিকল্প নেই। সম্পর্কোন্নয়নের এ পথ মসৃণ নয়, বন্ধুর। শত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন এবং তা স্থায়ীকরণ সহজ কিছু নয়। তাই মধ্যপ্রাচ্য শান্তির সুবাতাস বয়ে আনতে উভয় দেশকে আন্তরিকতা এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। দ্বিপাক্ষিক যথার্থ পদক্ষেপ ইসরাইল এবং ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসাথে তেলের বাজারেও স্থিতিশীলতা আসবে। ইরান এবং সৌদি আরব তাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীল তেলের দামের মধ্যে একটি সাধারণ স্বার্থ ভাগ করে নিতে পারবে।

বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কে অপার সম্ভাবনা

বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কে অপার সম্ভাবনা

ANALYSING THE WORLD
বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সফরের মাধ্যমে ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের দ্বার উন্মোচিত হয়। সেসময় বাংলাদেশের বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সৌদি সরকার ১ কোটি ডলার সহায়তা প্রদান করে। পরবর্তীতে সম্পর্কোন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে সৌদি সরকার। এক‌ই বছর তারা সর্বপ্রথম ২১৭ জন শ্রমিক নেয় এবং ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সর্বাধিক শ্রমিক আমদানি করে।
.

বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কে অপার সম্ভাবনা

.
প্রাচীনকাল থেকেই এ দুই অঞ্চলের মাঝে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সুফি সাধকদের পাশাপাশি আরবীয় বণিকদের অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের অন্যতম বাণিজ্যিক রুট ছিল বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যে যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দরে যাত্রাবিরতি ঘটতো এদের। বিভিন্ন কারণে অত্র অঞ্চলে অবস্থানকালে আরবীয় বণিকদের এখানকার মায়ায় পড়ে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। এসব কারণে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে আরবীয় সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। 
.
.
দ্বিপাক্ষিক সম্পৃতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল। তৎকালীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের অর্থায়নে মক্কা-মদিনায় গড়ে উঠেছিল বহু স্থাপনা। এসবের মধ্যে অন্যতম হলো, মাদরাসা, সরাইখানা, আরাফাতের ময়দানের খাল। এছাড়া তৎকালীন সময়ে নিয়মিত অর্থ সাহায্য প্রদানের কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হলেও পবিত্র হজ পালন ও বাণিজ্যিক লেনদেনের ফলে আদিকাল থেকেই দুই অঞ্চলের সম্পর্ক সুদৃঢ়। কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের চতুর্থ জনবহুল মুসলিম দেশ।
রুশ-ইউক্রেন সংকটের ফাঁদে নর্ড স্ট্রিম-২

রুশ-ইউক্রেন সংকটের ফাঁদে নর্ড স্ট্রিম-২

ANALYSING THE WORLD
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক "বিপদজনক ভূরাজনৈতিক অস্ত্র" খেতাবপ্রাপ্ত নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন প্রকল্পটি বর্তমানে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পৃথিবীর মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৭ শতাংশ উৎপাদন করে রাশিয়া। ইউরোপের প্রধান এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক তারা। ফলে দেশটির উপরে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ইউরোপের অনেক দেশই নির্ভরশীল। সোভিয়েত আমল তথা সত্তর এর দশক থেকেই জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ও বাল্টিক অনেক দেশ রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি করে থাকে।
.

রুশ-ইউক্রেন সংকটের ফাঁদে নর্ড স্ট্রিম-২

.
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই গ্যাস বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হলো ইউক্রেন। ২০০০ সালের দিকে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে রুশ-ইউক্রেন বিবাদ সৃষ্টি হয়। এতে রাশিয়া স্বকীয়তা বজায় রাখতে বাল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে নর্ড স্ট্রিম-১ পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা করে, যার গন্তব্যস্থল ছিল জার্মানি। রুশ গ্যাস রপ্তানি রুটের ৮০ ভাগ ট্রানজিটের অধিকারী ইউক্রেন স্বভাবতই এর বিরোধিতা করে। কিন্তু তৎকালীন জার্মান শাসক গেরহার্ড শ্রোয়েডারের সাথে সখ্যতার ফলে পুতিন ২০০৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পাইপলাইন প্রকল্পের চুক্তি সম্পাদন করতে সক্ষম হন। ৬ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি ২০১১ সালে শেষ হলে রাশিয়ার ইউক্রেন নির্ভরতা কমে আসে।
ইয়েমেনের কান্নায় কর্ণপাত নেই কেন

ইয়েমেনের কান্নায় কর্ণপাত নেই কেন

ANALYSING THE WORLD
জীবন যেখানে নির্জন, দরিদ্র, কদর্য, বর্বর এবং সংক্ষিপ্ত, সেখানে 'প্রকৃতির রাজ্য' বিরাজ করে। টমাস হবসের সেই প্রকৃতির রাজ্য‌ই যেন গড়ে ওঠেছে ইয়েমেনে। সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব-কলহ, ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা এখানে মানব বিবেককে করে দিয়েছে স্তব্ধ। নেই কোন সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা কাঠামো, ফলে তৈরি হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ঘটেছে আইনের বিলুপ্তি। সভ্য সমাজের অসভ্যতার নিদর্শন সৃষ্টিকারী এই দুর্ভাগ্যের শুরু এক দশক আগে।
.

ইয়েমেনের কান্নায় কর্ণপাত নেই কেন

আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ অপারেশন ডিসিসিভ স্টর্ম'র মাধ্যমে ইয়েমেনিদের আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তবে এই প্রক্রিয়ার প্রারম্ভ হয় ২০১১ সালের আরব বসন্ত হতে। দীর্ঘ বারো মাস সংগ্রামের পর ২০১২ সালে যবনিকাপাত ঘটে ৩২ বছরের স্বৈরশাসনের। অতঃপর গঠিত হয় পুরনো ধাঁচের নতুন সরকার। ক্ষমতার পালাবদল এবং পুরনো ব্যক্তিদের নতুন মুখোশ পরিধানের সুযোগে বৃদ্ধি পায় বিশৃঙ্খলা। নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে নব্বইয়ের দশকের হুথি আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। ঘাঁটি গাড়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস ও আল-কায়েদা। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে আনসার আলীর নেতৃত্বে হুথিরা নতুনভাবে মাথাচাড়া দেয় ক্ষমতাচ্যুত শাসকগোষ্ঠির ইন্ধন ও ইরানি সমর্থনে। ফলশ্রুতিতে ২০১৪ সালে ইরানের অস্ত্র সরবরাহ পেয়ে হুথিরা যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরবর্তীতে সমঝোতায় উভয় পক্ষের যৌথ রাষ্ট্রপরিচালনার সিদ্ধান্ত হলেও তা বেশিদিন টিকেনি। ২০১৫ সালে সৌদি জোটের অংশগ্রহণে শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসাত্বক যুদ্ধ।