-->

লিবিয়ার এক দশক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

আশির দশকে চিলি, কলম্বিয়ায় যা হয়েছিল, বিংশ শতকেও আরব তার ধারাবাহিকতা দেখতে পেল বিশ্ববাসী। পশ্চিমাদের শত্রুর তালিকায় পরিবর্তন এল। তাদের হিট লিস্টে...

বিগত এক দশক ধরে চলমান গৃহযুদ্ধে জর্জরিত আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি রাষ্ট্র লিবিয়া। আরব বসন্তের মোহে মাতাল হওয়া আজকের যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি দশ বছর আগেও সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় ছিল। কিন্তু সেই তেল সমৃদ্ধ দেশে আজ হাঁটতে গেলেই পায়ের নিচে পড়ে বোমা-মাইন। মাঝে মাঝে শোনা যায় রাশান ভাড়াটে সেনাদের ফেলে যাওয়া মাইন ফোটার বিকট শব্দ। বর্তমানের বসবাস অযোগ্য যুদ্ধ প্রবণ এ রাষ্ট্রটিতে ১৯৫০ সালে খনিজ তেল আবিষ্কার হয়। এরপর থেকে লিবিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
.

লিবিয়ার এক দশক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

.
১৯৫১ সালের ২৪শে ডিসেম্বর দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে একটি স্বাধীন রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। এরপর ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার সাধারণ জনগণের সমর্থন নিয়ে কর্নেল গাদ্দাফি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনুসি আদিবাসী গোষ্ঠীর রাজা ইদ্রিসকে সরিয়ে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে গাদ্দাফি দেশে বিরাজমান গোষ্ঠী বিভেদ সমাধানে দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি বারগা আদিবাসী গোষ্ঠীর এক নারীকে বিয়ে করে বিবিধ গোষ্ঠীতে বিভক্ত পুরো জাতিকে একত্রিত করতে সক্ষম হন। এই তরুণ শাসক তাঁর সমাজতন্ত্র ও আরব জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এক নতুন লিবিয়া গঠন করেন। এরই বাস্তবায়নে গাদ্দাফি লিবিয়ার তেল সম্পদ হতে প্রাপ্ত মুনাফা জনগণের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এই সামাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো ছিল পশ্চিমদের বিরাগভাজন হওয়ার অন্যতম কারণ। তবে গাদ্দাফির সময়োপযোগী শাসন ব্যবস্থার ফলে লিবিয়ার বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ জিডিপির দেশে পরিণত হয় লিবিয়া। কিন্তু সময়ের আবর্তনে গণতান্ত্রিক শাসনটি বহির্বিশ্বে সামরিক একনায়কতন্ত্র হিসেবেই বেশি পরিচিতি লাভ করে। আর এই পরিচিতি দেয়ার পেছনে সর্বাধিক ভূমিকা ছিল স্বার্থান্বেষী পশ্চিমা মহলের।
লিবিয়ার এক দশক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
লিবিয়ার এক দশক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা


আশির দশকে চিলি, কলম্বিয়ায় যা হয়েছিল, বিংশ শতকেও আরব বিশ্বে তার ধারাবাহিকতা দেখতে পেল বিশ্ববাসী। পশ্চিমাদের শত্রুর তালিকায় পরিবর্তন এল। তাদের হিট লিস্টে সমাজবাদের পরিবর্তে এল ইসলামি মৌলবাদ। আরব বসন্তের ঝড়ো বাতাসের ফাঁদে পশ্চিমারা শিকার করে নিল একে একে ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়াকে। মিথ্যা সমতার গল্প আর রঙিন দুনিয়ার লোভ দিয়ে পেট্রোলিয়াম সমৃদ্ধ লিবিয়ার স্বাধীনতা, শান্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেড়ে নেয়া হল। সামরিক আগ্রাসন ও গৃহযুদ্ধ চাপিয়ে কায়েম করল নিজ স্বার্থ, নিয়ন্ত্রণ নিল তেল কর্পোরেশনগুলোর।
.
.
আফ্রিকার শীর্ষ স্থানীয় ধনী দেশটির তেল সম্পদ লুটতে কয়েক দশক ব্যাপী সিআইএ এবং এম-সিক্সটিন পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীদের একত্রিত করছিল। এছাড়া আশির দশকে গাদ্দাফির সাথে মতবিরোধের জেরে ভার্জিনিয়া পালিয়ে যাওয়ার সময় জেনারেল হাফতারকেও হাত করে সিআইএ। ফলে ২০১১ সালে লিবিয়ায় বিদ্রোহ সংঘটনে পশ্চিমারা হাফতারকে বিদ্রোহী বাহিনীর প্রধান নিয়োগ দিয়ে সুষ্ঠুভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে।
২০১১ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক
২০১১ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক
.
পশ্চিমা মিডিয়ার কথিত ‘পাগল স্বৈরশাসক’ এবং ‘রক্তপিপাসু দৈত্য’-কে রুখতে ২০১১ সালে ন্যাটোর লিবিয়া আক্রমন করে। এর পেছনে সর্বাধিক ইন্ধন ছিল ফ্রান্সের। তারাই জাতিসংঘে রেজোল্যুশন ১৯৭৩ পাশ করানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় সর্বপ্রথম ‘অপারেশন ইউনিফাইড প্রটেক্টর’ পরিচালনা করেছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, ফরাসি বিমানগুলো লিবিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল রেজোল্যুশনটি পাশ হওয়ার আরো চার ঘণ্টা আগেই। এই অত্যুৎসাহের অন্যতম কারণ ছিল তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্টের আধপতিত জনপ্রিয়তার উন্নয়ন, আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয়তা বৃদ্ধি, অস্ত্র বাজার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালের পঞ্চম ফরাসি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফ্রান্সের সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন এই সারকোজি। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণ হল, ক্ষমতায় যেতে গাদ্দাফি থেকে অর্থ নেয়ার বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া। ২০০৭ সালের নির্বাচনে নিকোলাস সারকোজি গাদ্দাফি থেকে ৫০ মিলিয়ন ইউরো নেয়ার ঘটনায় ফ্রাঞ্চের আদালতে এখনো মামলা চলছে। পশ্চিমাদের এসব স্বার্থের কথা জেনেই ন্যাটোর অভিযান শুরুর পর গাদ্দাফি বলেছিলেন, "গণতন্ত্র না, ওরা আমাদের তেল চুরি করতে এসেছে"। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। ন্যাটোর অস্ত্রে সজ্জিত বিদ্রোহীদের দ্বারা গাদ্দাফি হত্যা ৪২ বছরের স্বৈরশাসনের ইতি টানলেও রক্তারক্তির ইতি টানতে পারেনি; বরং তা পরবর্তীতে অসুরের রূপ ধারণ করে।
তৎকালীন ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি
তৎকালীন ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি
.
গাদ্দাফির মৃত্যুর পর ২০১২ এবং ২০১৩ সালে লিবিয়ার পরিস্থিতি মোটামুটি ভালোই ছিল। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাত্র আট মাসের মাথায়ই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তেলের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, মানুষ মোটামুটি নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, লিবিয়া আসলেই গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা করছে। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ পুরোপুরি সিদ্ধি না হওয়ায় ২০১৪ সালে জেনারেল হাফতারের মাধ্যমে পুনরায় আগ্রাসন শুরু করে তারা। গাদ্দাফি-পরবর্তী যুগে নিজস্ব স্বার্থ সুরক্ষিত করতে লিবিয়াকে পরিণত করা হয় আন্তর্জাতিক ছায়াযুদ্ধের দাবার ঘুঁটিতে। অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া লিবিয়ার দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধকে ইসলামপন্থী এবং ইসলামবিরোধী শক্তির সংঘর্ষ হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু দ্বন্দ্বটি ছিল মূলত সংস্কারপন্থী বা গণতন্ত্রপন্থীদের সাথে স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে চাওয়া শক্তির। বিভিন্ন কারণে ইসলামপন্থীদের অনেকেই সংস্কারপন্থীদের সাথে যোগ দিয়েছে, আর তাদেরকে দমন করতে গিয়ে সামরিকতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চাওয়া শক্তি ইসলামবিরোধীদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মূল দ্বন্দ্ব ধর্মকেন্দ্রিক নয়, ধর্ম এখানে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অনুষঙ্গ মাত্র।
.
.
গৃহযুদ্ধে বিজয়ী আন্তর্জাতিক মদদপুষ্ট হাফতার ২০১৯ সাল অবধি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। পরিশেষে দেশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে রাজধানী ত্রিপলিতে অভিযানের প্রস্তুতি নেয় বিদ্রোহী বাহিনী। এমতাবস্থায় আগ্রাসন রুখতে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার বহির্বিশ্বে সাহায্য চায়। তবে সাহায্যের পরিবর্তে সুকৌশলে লিবিয়ার উপরে চাপিয়ে দেয়া হয় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। ঠিক ওই সময়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকা লিবিয়ার বৈধ সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তুরস্ক। স্বার্থ বিবেচনায় লিবিয়ায় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত তুর্কি পার্লামেন্টে ৩২৫- ১৮৪ ভোটে পাশ হয়। ‘বৈধ সরকারকে সমর্থন এবং একটি মানবিক ট্র্যাজেডি এড়াতে’ তুরস্ক সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
হাফতার বাহিনীর পোস্টার ও কয়েকজন সেনা
হাফতার বাহিনীর পোস্টার ও কয়েকজন সেনা
.
লিবিয়ায় তুর্কি সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সিরিয়ার সাথে তুলনা করতে গেলে লিবিয়ার লাগামহীন গৃহযুদ্ধ ও ভৌগোলিক অবস্থান সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিরিয়ার যুদ্ধে আঙ্কারা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সুবিধা পেয়েছে। পাশাপাশি তারা মার্কিন ও রাশিয়ার ক্ষমতার লড়াই থেকেও সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু এখানে প্রতিপক্ষের তালিকায় ফ্রান্স, মিশর, রাশিয়া থেকে শুরু করে প্রায় সবাই। তবে সব ঝুঁকি বাজিমাত করে তুরস্কের গোয়েন্দা বাহিনী এবং কিলার ড্রোন হাফতারের বাহিনীকে ত্রিপলির উপকূল থেকে তাড়িয়ে ৪৫০ কিলমিটার পূর্বে সিরত শহর পর্যন্ত নিয়ে যায়। গত বছরের ঠিক এই সময়ে আঙ্কারার ড্রোন বৃষ্টি হাফতার এবং তাঁর আন্তর্জাতিক সঙ্গী, বিশেষ করে সৌদি এবং ফরাসিদের আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করে। অর্থনৈতিক স্বার্থেই লড়াইকে যুদ্ধের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছেন। তবে দশ বছরের যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে পশ্চমাদের তেমন কোন ফায়দা হয়নি। সাদ্দামকে হটিয়ে যেমন ইরাককে কার্যত ইরানের হাতে তুলে দিল আমেরিকা, ঠিক তেমনি গাদ্দাফিকে হত্যা করে লিবিয়াকে কার্যত রাশিয়া এবং তুরস্কের আয়ত্তে দিয়ে দেওয়া হলো এখন।
.
.
একাধিক সমঝোতার পর, মার্কিন সমর্থন আর চাপে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এই বছরের ১০ই মার্চ একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারের প্রধানগণ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং নিরপেক্ষ বলে ধারণা করা হচ্ছে। শর্ত অনুযায়ী এই সরকারকে আগামী ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে কী হবে এবং পরের পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষক মহল এখন সরগরম।
বিদেশি ও ভাড়াটে সেনাদের দেশ ছাড়ার আহ্বানে লিবিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাজলা আল-মঙ্গুশ (25 march, 2021
বিদেশি ও ভাড়াটে সেনাদের দেশ ছাড়ার আহ্বানে লিবিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাজলা আল-মঙ্গুশ
(25 march, 2021
.
প্রথমত, লিবিয়া-তুরস্ক সমুদ্র চুক্তির প্রতি নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে এই চুক্তি বহাল থাকার কথা বলেছে মানফি সরকার। ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া ও তুরস্কের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার ব্যাপী সমুদ্র সীমা থাকলেও ইসরায়েল, গ্রিক সাইপ্রাস, মিসর জোট তাদের বঞ্চিত করতে একটি চুক্তি করেছিল। এর বিপরীতে তুরস্ক ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর আলোচ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। একে এরদগানের গত এক দশকের সবচেয়ে বিচক্ষণ চাল হিসেবে ধরা হয়। এর মাধ্যমে তিনি অত্র অঞ্চলের অন্য খেলোয়াড়দের এক কঠিন বার্তা দেন। এছাড়া সম্প্রতি তুর্কি-মিশর সম্পর্কেরও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। মিশরও তুর্কি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্বীকার করে নেওয়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ইসরায়েলী জোটের স্বাক্ষরিত ইস্টমেড গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি অনেকটা অকেজো হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভূগর্ভস্থ এই গ্যাস পাইপলাইন ভূমধ্যসাগরের তলদেশ ব্যবহার করে ইসরায়েলের গ্যাস নিয়ে যাবে ইউরোপে। তাই লিবিয়া-তুরস্ক চুক্তি বাতিল করতে সম্প্রতি ত্রিপোলি গিয়েছিলেন গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস। কিন্তু মিৎসোতাকিসের মুখের ওপর না করে দিয়েছেন মানফি। অনেকের মতে, লিবিয়ায় যুদ্ধ থামাতে নয়, বরং এই চুক্তি বহালের তাগিদেই ত্রিপোলিতে তুর্কি সৈন্যের বর্তমান অবস্থান।
.
.
স্বভাবতই ফান্স-রাশিয়া জোটের নিকট নবগঠিত সরকারের আংকারা প্রীতি কাম্য নয়। তবে অতিরিক্ত প্রীতি না দেখালেও কৃতজ্ঞাতার্থে‌ ভাল সম্পর্ক যে রাখবে, তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। ঐকমত্যের সরকার গঠনের পরপর ১৫ জন মন্ত্রী সহকারে সরকার প্রধানের তুরস্ক সফর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সবার কাছেই। সফরে পূর্বের চুক্তিসমূহ বজায় থাকবে জানালেও লিবিয়ায় তুর্কি সেনা থাকার বিরোধিতা করেছে মানফি-দাবিবেহ সরকার। এতে বোঝা যাচ্ছে, এই সরকার অন্ধভাবে তুর্কি দাবি পূরণ করবে না, বরং স্বকীয় অবস্থান বজায় রাখবে। আর এই স্বকীয়তার উপরই নির্ভর করছে লিবিয়ার ভবিষ্যৎ। লিবীয় পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে আগামীর ভূমধ্যসাগরের তেল-গ্যাসের মালিকানা ও তুর্কি-কাতার বলয়ের ভবিষ্যৎ।
লিবীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তুরস্ক সফরকালে বক্তব্য দিচ্ছেন এরদোয়ান
লিবীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তুরস্ক সফরকালে বক্তব্য দিচ্ছেন এরদোয়ান
(
April 12, 2021)

পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে লিবিয়ায় স্থায়ী শান্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা অনেকগুলো শর্তের ওপর নির্ভরশীল। সামনের নির্বাচনে সরাসরি আংকারা কিংবা ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রার্থী জয় লাভ করলে ফ্রান্স-সৌদি-রাশিয়া বলয় মেনে নেবে না। ফলস্বরূপ ২০০৭ এর হামাস ও ২০১৩ এর মিশরে ব্রাদারহুডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। নতুন করে গৃহযুদ্ধ উস্কে দেয়া হতে পারে। অপরদিকে কট্টর বিরোধী কেউ ক্ষমতায় এলে সমস্ত তুর্কি প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তুর্কি কোম্পানিগুলোর বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, চুক্তি, লিবিয়া পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখা; সবকিছুই নস্যাৎ হবে। উত্তর আফ্রিকা থেকে তুর্কি-কাতার বলয়ের রাজনৈতিক প্রভাবের প্রস্থান নিশ্চিত হবে। ফলে তুর্কিদের জন্যে আফ্রিকা প্রবেশের ইচ্ছা স্বপ্নই রয়ে যাবে। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের তুর্কি বিনিয়োগ আলোর মুখ দেখবে না। তাই লিবিয়ার পাশাপাশি আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়াকে সৌদি বলয় থেকে রক্ষা করতে এরদগান ও ব্রাদারহুড সমঝোতা করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা পরোক্ষ প্রার্থী দিতে পারে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার নির্বাচনে।
লিবিয়ার এক দশক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
লিবিয়ার এক দশক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
.

আজ প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধে আসল পরাজিত লিবিয়ার জনগণ। গাদ্দাফির সাজানো বাগানে এখন গোলাবারুদের গন্ধ। গাদ্দাফি-পরবর্তী প্রজন্ম সন্ত্রাস আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে আজ। বেকারত্ব ঘুচাতে তরুণ সমাজ যাচ্ছে মিলিশিয়া গোষ্ঠীতে, হাতে তুলে নিচ্ছে খাতা-কলমের পরিবর্তে সমরাস্ত্র। মানসিক বিকাশ হচ্ছে নৃশংস পরিবেশে। ইউরোপে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মরছে লিবিয়ার নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ। ইরাকিদের মতোই লিবিয়ার সমাজের একটি অংশ, যারা পশ্চিমা মদদে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন, তারাই আবার গাদ্দাফির জমানায় ফিরে যেতে চাইছে। তবে ন্যাটোর বোমা বর্ষণের শিকার ৩৫ হাজার জীবন, দুই লক্ষ লোকের ঘরবাড়ি, ন্যাটো সমর্থক মিলিশিয়াদের লুটে নেয়া গাদ্দাফির ‘স্টেট-অ্যাসেট’ ৩৬০ বিলিয়ন ডলার হয়তো ফিরে আসবে না আর। তবু লিবীয়রা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের আশায় বুক বাঁধছে নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে করোনার বিরুদ্ধে। এহেন পরিস্থিতিতে দেশের কল্যাণে লিবিয়ার নতুন নেতৃত্বকে অবশ্যই নিরপেক্ষ কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। আর শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলা। তাই অবকাঠামো নির্মাণ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতি সত্তর নয়া সরকারকে কাজ শুরু করতে হবে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.