-->

ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন

ইস্তাম্বুল খাল মধ্যপ্রাচ্য সহ ইউরোপে রাশান সামরিক উপস্থিতি দ্রুততর এবং কার্যকর করতে পারে। বর্তমানে সিরিয়ায় রাশিয়ার দুটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সম্প্রতি..

পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন স্থাপনা এবং প্রকল্পকে কেন্দ্র করে অনেক দেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার নজীর রয়েছে। ঠিক তেমনি চলমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী প্রকল্প হলো তুরস্কের 'ইস্তাম্বুল খাল'। বর্তমান তুর্কি প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যেই বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজ দেশে "নির্মাণ পাগল" নেতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তুরস্কের সর্ববৃহৎ মসজিদ, বসফরাস টানেল ও অত্যাধুনিক ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর নির্মাণের পর এবার ইস্তাম্বুল খাল প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন তিনি। এই খাল তৈরির পরিকল্পনা তুর্কি রাষ্ট্রনেতা ও জনগণের মাঝে নতুন নয়। বিগত পাঁচ'শ বছরে দশ বার এই খালের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। উসমানীয় সম্রাজ্যের দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক সুলতান সুলেমান কর্তৃক এর ধারণা প্রবর্তিত হওয়ার পর সর্বশেষ অপর দূরদর্শী শাসক এরদোগানের ২০১১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে আলোচনায় আসে।
.

ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন

.
যুক্তির খাতিরে এরদোগান অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের হিসেব পেশ করলেও সবাই জানে এর পেছনে তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার। বিগত ঊনিশ বছরের শাসনামলে দেখা যায়, তিনি তাঁর কথাবার্তা, কার্যক্রম এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অটোমান থেকে আতাতুর্ক যুগের শুরু পর্যন্ত সাময়কার ধ্যান-ধারণাকে প্রধান্য দিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে পূর্বের সেই তুর্কি সম্রাজ্য ফিরিয়ে আনতে এরদোগান যে কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছেন, তার অন্যতম বড় অংশ হলো ইস্তাম্বুল খাল প্রকল্প। তাঁর মতে, পানামাকে যেভাবে পানামা খাল এবং মিসরকে যেভাবে সুয়েজ খাল বৃহৎ ফায়দা দিচ্ছে, তেমনি ইস্তাম্বুল খালও তুরস্কের সার্বিক রূপ পাল্টে দেবে।
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
.
গত এপ্রিলে আন্তঃমহাদেশীয় শহর ইস্তাম্বুলের ইউরোপ অংশে ৪৫ কিলোমিটারব্যাপী 'ইস্তাম্বুলে খাল' খননের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই খাল খননকে কেন্দ্র করে তুরস্কে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি খালটি আদৌ তৈরি করা সম্ভব কিনা, তা নিয়েও জনমনে তৈরি হয়েছে সংশয়। খাল খননের বিপক্ষে বিরোধীদের শক্তপোক্ত যুক্তিও আছে বৈকি। তাদের মতে, ইস্তাম্বুলে ইতোমধ্যেই বিশ্বের সর্বাধিক ব্যস্ত জলজ পথ বসফরাস প্রণালী রয়েছে, যে পথে সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ বিনা টোলে যাতায়াত করতে পারে। তদুপরি নতুন খাল খননের প্রয়োজন নেই। খালটি খননে শহরটির উত্তর অংশের ৩৫০ হেক্টর জমির দুই লাখ গাছ কাটতে হবে, যা অগ্রহণযোগ্য প্রাকৃতিক নিধন। এই অঞ্চলে রয়েছে মিষ্টি পানির উৎস, যা সাজলিদার বাঁধের মাধ্যমে শহরবাসীর চাহিদা মেটায়। খালটি এই বাঁধকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করবে এবং পার্শ্ববর্তী সকল মিষ্টি পানির উৎসকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভূমিকম্প প্রবণ এই এলাকায় বিশাল কৃত্রিম খাল খনন ভৌগলিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে অত্র অঞ্চলে বিপদও ডেকে আনতে পারে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুর্কি লিরার প্রচন্ড দর পতনের পর বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মেগা প্রজেক্টের ব্যায় ভার তুরস্কের পক্ষে বহনযোগ্য নাও হতে পারে। এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ঘোষিত ব্যায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণও খরচ হতে পারে। সর্বশেষ বিপত্তিটি হলো, তিনটি টানেল ও ৬-৭ টি সেতু বিশিষ্ট সর্ববৃহৎ এই মেগা প্রকল্পের শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ অর্থ সরকার ইস্তাম্বুল কর্তৃপক্ষ থেকে নেয়ার পরিকল্পনা জানালেও শহরটির বিরোধী দলীয় মেয়র তাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
.
তবে উল্লিখিত আপত্তিগুলোর যথেষ্ট যৌক্তিকতা থাকলেও এরদোগান তার নিজ পরিকল্পনায় অটল থেকে দ্রুত কাজ শুরু করতে বদ্ধ পরিকর। তাঁর মতে, খালের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ হবে। ইতোমধ্যেই কাতারের রাজ পরিবার সেখানে কিছু জমি কিনে নিয়েছে। এছাড়া নতুন খাল খনন হলে এটার উপার্জন শুধুমাত্র জাহাজ পারাপারের ওপরই নির্ভরশীল হবে না। যেমন বসফরাস প্রণালী দিয়ে পার হওয়া জাহাজ থেকে তুর্কি সরকার কোন টাকা আয় করতে না পারলেও এই প্রণালীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পর্যটন এবং এই সংশ্লিষ্ট সমস্ত সেক্টর থেকে প্রতিবছর তুরস্কের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। একইভাবে নতুন খাল খনন হলে এই খনন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে এর তীরবর্তী এলাকায় সরকারের ট্যুরিজম, আবাসিক পরিকল্পনা এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত যে বিশাল পরিকল্পনা আছে, তা থেকে প্রচুর পরিমাণে অর্থ উপার্জিত হবে। বর্তমানে সরকার ইস্তাম্বুল খালের দু'পাশে ৫ লাখ মানুষের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে। এর ফলে বাড়তি ৩ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব আদায় হবে বলে আশা করছে তারা। ধারণা করা হচ্ছে, বিগত চার দশকে পাঁচগুণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া তুরস্কের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শহর ইস্তাম্বুলের এই প্রকল্পটির মাধ্যমে বিশ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হবে, যা মোট জিডিপিতে শতকরা ১৯ ভাগ ভূমিকা রাখবে।
.
.
এছাড়া বসফরাস প্রণালীর তুর্কি কর্তৃপক্ষ যদি অপেক্ষাকৃত কম জাহাজ চলাচল করায় এবং জাহাজের সিরিয়াল প্রদানে কিঞ্চিৎ বিলম্ব আনে, তাহলে জাহাজগুলো অনায়াসেই ইস্তাম্বুল খাল ব্যবহার করবে টোল দিয়ে হলেও। কারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য এক দিন বিলম্বও বড় বিষয়। এছাড়া যেসব বড় টেংকার বসফরাসে চলাচল করতে অসুবিধা হয়, সেগুলোও ইস্তাম্বুল খাল ব্যবহার করতে পারে।.
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
.
মূলত মন্ট্রাক্স চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে অত্র অঞ্চলের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও সামরিক ক্ষেত্রে তুরস্কের আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ইস্তাম্বুল খাল খননের প্রধান কারণ। ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে লিবিয়া, আজারবাইজান ও সিরিয়ায় সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে তুরস্ক। সর্বশেষ গত ১ তারিখ সিরিয়ার মতো ইরাকেও ঘাঁটি তৈরির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে বসফরাস প্রণালীতে তুরস্ক যা পারছে না তা হলো, বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায়, কৃষ্ণ সাগরে মিত্র ন্যাটো বা বৈশ্বিক শক্তির অবাধ সামরিক উপস্থিতি সৃষ্টি। নতুন কৃত্রিম খাল দিয়ে কৃষ্ণ সাগরে তুরস্ক বন্ধু প্রতীম রাষ্ট্র এবং ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর উপর খবরদারি করতে পারবে। যদিও এটি রাশিয়া সহজে মেনে নেবেনা। কারণ রাশিয়ার পুরো বছরব্যাপী একমাত্র সচল বন্দর এবং দু'টি সামরিক ঘাঁটি কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত, আর সেখানে মার্কিন বা ন্যাটোর অবাধ উপস্থিতি অনেকটা রাশিয়ার ঘাঁড়ে আমেরিকার শ্বাস ফেলার মতো। এজন্যে অনেকে তুর্কি এই প্রকল্পের পেছনে মার্কিন হাত থাকার কথাও বলেন।
.
.
তবে বিপরীত দিকে রাশিয়াও ফায়দা লুটতে পারে বাণিজ্যিক এবং সামরিকভাবে। বসফরাস প্রণালী প্রয়োজনানুযায়ী সরু এবং সুক্ষ বাঁক বিশিষ্ট হওয়ায় এর ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট সাইজের চেয়ে বড় জাহাজ চলাচল করতে পারে না। পুরো বিশ্বের তেল-গ্যাস সাপ্লাইয়ের শতকরা ৩ ভাগ এই পথে হয় বিধায় এখানে ব্যাপক ট্রাফিকের সৃষ্টি হয়, ফলে যাতায়াতের সিরিয়াল পেতে একেকটি জাহাজের এক থেকে তিন দিন সময় লাগে। এর মধ্যে দুর্ঘটনার ফলে বিলিয়ন ডলার ক্ষতির উদাহরণও রয়েছে। তুর্কি সরকারের তথ্যমতে, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ৪৬২ টি দুর্ঘটনা হয় এই প্রণালীতে। দুর্ঘটনা ছাড়া যুদ্ধও কৃষ্ণ সাগরীয় দেশগুলোর একমাত্র এই জলজ পথকে অচল করতে পারে, যেমন আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে সুয়েজ খালে কয়েকটি জাহাজে বোমা বর্ষণের ফলে কয়েক বছরের জন্য এই খাল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই বসফরাসের বিকল্প পথ কৃষ্ণ সাগর তীরবর্তী খনিজ সম্পদ নির্ভর দেশগুলোর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ।

ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
ইস্তাম্বুল খালে এরদোগানের তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন
.
ইস্তাম্বুল খাল মধ্যপ্রাচ্য সহ ইউরোপে রাশান সামরিক উপস্থিতি দ্রুততর এবং কার্যকর করতে পারে। বর্তমানে সিরিয়ায় রাশিয়ার দুটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সম্প্রতি আফগানিস্তানেও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর রাশান হস্তক্ষেপ বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তবে খাল কার জন্যে আশির্বাদ হবে তা নির্ভর করছে কার সাথে তুরস্কে সম্পর্ক ভাল থাকে তার উপর।
.
.
আর খালের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রের সুরক্ষা কাঠামো নিশ্চিত করতে চাইলে বহির্শক্তিগুলোকে ইস্তাম্বুল খালকে মন্ট্রাক্স বা নতুন কোন চুক্তির আওতায় আনতে হবে। তখন তুরস্ক তাঁর শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে নিজ অনুকূলে চুক্তি সই করতে রাজি হতে পারে। উল্লেখ্য,  তুর্কি রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস করেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের দুর্বল অবস্থার কারণে আন্তজার্তিক শক্তিগুলো তুরস্কের স্বার্থের বিপরীতে মন্ট্রাক্স চুক্তি করে। এর ফলে বিদেশী জাহাজগুলো কোনো টোল না দিয়েই বসফরাস প্রণালী ব্যবহার করে, তাই ইস্তাম্বুল প্রণালী নির্মাণ অত্যাবশ্যক।
.
.
তবে খালটি তৈরি করতে এরোদোগানকে নিজ দেশেই যথেষ্ট বিরোধীতার মুখে পড়তে হবে। বর্তমানে তুরস্কে তাঁর জনপ্রিয়তা পড়তির দিকে। বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শহর আঙ্কারা, ইজনিক ও ইস্তাম্বুলে হেরেছে তার দল একেপি। "ইস্তাম্বুল জয় করা মানে তুরস্ককে জয় করা"--এরদোগানের নিজ মুখে বলা এই কথা যদি সত্যি হয়, তবে তাঁর জন্যে ভবিষ্যতে নিজ দেশেই বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। উল্লেখ্য যে, এরোদোগান নিজেও নব্বইয়ের দশকে ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের হতাশাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামি জাতীয়তাবাদের ডাক দিয়ে ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসেন।
.
.
স্বদেশীয় এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্বপ্নের ইস্তাম্বুল খাল যদি প্রেসিডেন্ট এরদোগান বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারেন, তবে আশা করা  যায়, বিশ্বও এক নতুন দুর্ভেদ্য তুরস্ককে দেখবে। যার আধিপত্য থাকবে ইসলামি বিশ্ব ও তৎকালীন উসমানীয় সম্রাজ্যের অধীন ভূখন্ড জুড়ে এবং ছড়ি ঘুরাবে বিশ্ব রাজনীতিতে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.