-->

পুঁজিবাদ ও আমলাতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক

পুঁজিবাদের সর্বাধিক নির্মম ফল হল "ব্যবসা-সংকট"। পুঁজিপতিদের কারখানাগুলোর সৃষ্ট পণ্যের মূল ক্রেতা গোষ্ঠী তথা শ্রমিক শ্রেণি যখন দারিদ্র্যের শেষ পর্যায়ে

সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত বিশ্বের পশ্চাৎপদ গরিব দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ শত্রু হিসেবে পুঁজিবাদ, মৎসুদ্দি পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং আমলাতন্ত্রের সক্রিয়তা রয়েছে বর্তমানে। এসবের মধ্যে পুঁজিবাদ ও আমলাতন্ত্র একে অপরের সহযোগি হিসেবে ভূমিকা রেখে বিশ্ব সভ্যতার সর্বাধিক ক্ষতি সাধন করছে। তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই দুটি প্রপঞ্চ সম্পর্কযুক্ত। মূলত শ্রেণিসমাজের দীর্ঘদিনের সৃষ্ট এই আমলাতন্ত্রকে পুঁজিবাদই শক্তিশালী করেছে।

পুঁজিবাদ ও আমলাতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক


আমলাতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ Bureaucracy এর মূল উৎপত্তি ফ্রেঞ্চ শব্দ থেকে। ফরাসী Bureau শব্দের অর্থ ডেস্ক বা অফিস, আর গ্রিক শব্দ ক্র্যাটোস অর্থ শাসন বা রাজনৈতিক শক্তি। প্রশাসকবর্গকে অথবা প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গকে ও প্রশাসনিক কার্যবিধি বোঝাতে প্রত্যয়টি ব্যবহার হয়ে থাকে।


শাস্ত্রগতভাবে বলতে গেলে, আমলাতন্ত্র হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা, যাতে স্থায়ী সরকারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব বিভাজনের মাধ্যমে সরকারের সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকে। এসব কর্মকর্তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বিধায় জনগণের ভোটে সরকার পরিবর্তিত হলেও এরা স্বপদে সমাসীন থাকেন।


আমলাতন্ত্র শুরু থেকেই গণতন্ত্র বিরোধী বলে আমলারা কখনোই গণতন্ত্র কামনা করেনা। আমলাতন্ত্র জনগণকে জিম্মি করে শোষণ ও নির্যাতন করার মাধ্যমে জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত হয়। গরীব দেশগুলোর আমলারা জনগণকে পরাধীন করে রেখে জনগণের শ্রমফল ভোগ করে, জনগণকে বিপদে ফেলে দুর্নীতি করে দেশীয় সম্পদ বিদেশে পাচার করে।

প্রতীকী আমলাতন্ত্র
প্রতীকী আমলাতন্ত্র

সাধারণত পশ্চাৎপদ তথা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকাংশই আমলা নির্ভর। যে দেশ যত পিছিয়ে পড়া, সে দেশের আমলা সংখ্যা ও তাদের ক্ষমতা তত বেশি থাকে। এই শাসনব্যবস্থায় আমলারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণে বিরোধিতা করে। উৎপাদন কাজে অংশগ্রহণ না করেই রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে আসীন হওয়ার লিপ্সা এবং বেতন বাড়ানোর চিন্তায় থাকে এরা।


আমলাতন্ত্রের আওতাধীন দেশে জনগণকে আমলাদের কাছে যেতে হয় নিজ অধিকার আদায় করতে, কেননা কখনো বিপ্লব বা ভোটের মাধ্যমে জনগণ ক্ষমতায় গেলেও তারা জানেনা কিভাবে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতে হয়। ফলে অধিকাংশ পশ্চাৎপদ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে শাসনকার্যের অপরিপক্বতার দরুণ জনগণের সরকার আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে। আর এই নির্ভরশীলতার কারণে গণতন্ত্র সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়না, বরঞ্চ আমলাদের দাপটে প্রহসনে পরিণত হয়।


উন্নত দেশগুলোতে তৃতীয় বিশ্বের ন্যায় আমলাদের দাপট না থাকলেও তারা যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হয়। এরাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে, যুদ্ধ বাঁধায়, গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে হত্যা করে দরিদ্র দেশগুলো দখলে প্ররোচনা দেয়ার মাধ্যমে সম্রাজ্যবাদকে উস্কে দেয়, সৃষ্টি হয় উগ্র পুঁজিবাদের।


পুঁজিবাদ হল এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদন যন্ত্রের ব্যক্তিগত মালিকানা বিদ্যমান এবং শুধুমাত্র লাভের আশায় পণ্য তৈরি করা হয়; জনগণের সেবা কিংবা চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে নয়। এখানে সর্বদা ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ করে ব্যবসায়িরা ব্যক্তিগতভাবে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, যেখানে সরকারি হস্তক্ষেপ থাকেনা। পুঁজিবাদে জনগণ যদি না খেয়েও মারা যায়, তাতেও পুঁজিপতিরা নিজ অবস্থান থেকে সরে আসেনা।

প্রতীকী পুঁজিবাদ
প্রতীকী পুঁজিবাদ

মুনাফার লোভেই উৎপাদন যন্ত্রের মালিকরা যন্ত্র এবং শ্রমিককে কাজে লাগিয়ে পণ্য তৈরি করে, যা জনগণের অভাব মেটায়। কিন্তু সেই পণ্য জনগণের জীবনধারণের জন্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, তা বিক্রি করে মুনাফা না আসলে পুঁজিপতিরা সেটির উৎপাদন বন্ধ করে দেন। কাজেই মুনাফার জন্যেই পণ্য তৈরি করা হয় বিধায় লাভকে পুঁজিবাদী সমাজের প্রধান কথা হিসেবে গণ্য করা হয়।


পুঁজিবাদী সমাজের কয়েকটি প্রগতিশীল স্তর রয়েছে। যেমন, বাণিজ্যিক ধনতন্ত্র, শিল্পনির্ভর ধনতন্ত্র এবং অর্থনির্ভর ধনতন্ত্র। সপ্তদশ শতাব্দীতে গ্রীস, রোম, আরব এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে বিনিয়োগের যে বিকাশ ঘটে, তা বাণিজ্যনির্ভর ধনতন্ত্রেরই সূচনা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিকাশের সাথে উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে এবং শিল্পনির্ভর পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশ ঘটে। আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্ব শুধু শিল্প কল-কারখানাই নয়, বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাংক, জীবন বিমা ইত্যাদিতে অর্থ লগ্নি করে পুঁজি গঠন অব্যত রাখছে। এভাবেই অর্থনির্ভর ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটে।


বৈপ্লবিক রুপান্তরের মাধ্যমে সামন্তবাদী সমাজ পুঁজিবাদী সমাজে পদার্পণ করে বিধায় উৎপাদন যন্ত্র তথা উৎপাদন কৌশলে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। মূলত সামন্ত সমাজের কাঠামোগত এবং গুণগত পরিবর্তনের ফলেই পুঁজিবাদী সমাজের উত্থান ঘটে। এতে পূর্বের ভূমি দাসরা পরিণত হয় মুক্ত শ্রমিকে, বেড়ে যায় পণ্যের উৎপাদন, ঘটে নগর ও বাজারের প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। তাই পুঁজিবাদী সমাজ সভ্যতার বিকাশে এক প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
পুঁজিবাদের পিরামিড
পুঁজিবাদের পিরামিড

তবে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা সভ্যতার বিকাশকে দ্রুততর করলেও টেকসই করে তুলতে পারেনা। পুঁজিবাদের বিভিন্ন ফলগুলোই পুনরায় পুঁজিবাদকে ধ্বংসে মুখে দাড় করায়। পুঁজিবাদী সমাজে উন্নয়ন ঘটে, তবে তা সব শ্রেণির নয়, শুধুমাত্র ধনী শ্রেণির। এই ব্যবস্থায় ধনীরা আরো ধনী হয়, দরিদ্ররা আরো দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হয়। অল্প পুঁজির অধিকারী মধ্যবত্ত শ্রণি বড় পুঁজিপতিদের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে সর্বস্বান্ত হয়ে দরিদ্র শ্রমিকে পরিণত হয়।


এই পুঁজিবাদের সর্বাধিক নির্মম ফল হল "ব্যবসা-সংকট"। পুঁজিপতিদের কারখানাগুলোর সৃষ্ট পণ্যের মূল ক্রেতা গোষ্ঠী তথা শ্রমিক শ্রেণি যখন দারিদ্র্যের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তাদের পণ্য ক্রয়ের ক্ষমতা আর থাকেনা। আর বাজারে পণ্য বিক্রি না হলে কারখানা মালিকরাও কারখানা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে, না খেয়ে মারা যায় দরিদ্র জনগণ। পুঁজিবাদের এই দুর্দশাকেই মূলত ব্যবসা-সংকট বলা হয়।


পুঁজিবাদ লালনকারী অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ত্রিশ বছরেই তিন বার এই ব্যবসা-সংকট দেখা দেয়। শেষের ১৯৩০ সালের সংকটটিতে এক কোটি ত্রিশ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়। তাদের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় ঘুরে বেড়াত খাবারের সন্ধানে, গুদামে পঁচে যাওয়া খাদ্য ডাস্টবিনে রেখে গেলে তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তো এরা। চার্লি চ্যাপলিনের 'মডার্ন টাইমস' নামক সিনেমায় রাস্তায় ছেলেমেয়েদের পঁচা খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ির দৃশ্য এই নির্মম পরিস্থিতির ধারণা দেয়।
পুঁজিবাদ
পুঁজিবাদ

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন কারখানা, গুদাম খাদ্য দ্রব্য এবং পোশাকে ভরপুর হয়ে থাকত, অপরদিকে জনগণ না খেয়ে শীতে রাস্তায় কাতরে মরত। সম্প্রতি করোনাকালীন সময়ে এই নির্মমতা বিশ্বে আবার পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায় সকল দোকানপাট, কল-কারখানা বন্ধ থাকায় মানুষ না খেয়ে দিনাতিপাত করছে, কিন্তু অপরদিকে পণ্য পঁচে যাওয়ায় তা ক্ষুধার্থ অসহায় জনগণের মাঝে বিতরণ না করে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার দুটি ভিডিও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। একটিতে দেখা যায়, খামারে দুধ বিক্রি না হওয়ায় তা ড্রেনে ফেলে দেয়া হচ্ছে, আর খামারের বাইরে থাকা ড্রেনের মুখে কিছু শিশু বালতি ভরে ড্রেন থেকে দুধ সংগ্রহ করছে আহারের জন্য।


পুঁজিপতিরা এই ব্যবসা-সংকট থেকে মুক্তি পেতে বাড়তি জিনিসপত্র নষ্ট করে ফেলে, উৎপাদন যন্ত্রের খানিকটা ধ্বংস করে এবং শ্রমিকদের মাইনে কমিয়ে দিয়ে অধিক খাটানোর চেষ্টা করে। এর ফলে উৎপাদন যন্ত্র খাটিয়ে কিছুদিন বেশ লাভ হয় তাদের, কিন্তু ব্যবসা বেশ জেঁকে উঠবার আগেই পুণরায় ব্যবসা-সংকট শুরু হয়। এভাবে কিছুদিন পরপর ব্যবসা-সংকট হওয়া পুঁজিবাদের নির্মম ফল।


পুঁজিবাদে উৎপাদনের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা হওয়ায় বাজারে দরিদ্রদের আর্থিক সক্ষমতা কমে গেলে পুঁজিপতিরা ধনীদের বিলাস দ্রব্যের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এক দিকে দরিদ্রদের হাত থাকে অর্থশুন্য, অপরদিকে পুঁজিপতিদের অর্থের পাহাড়; যার কারণে তারা বিলাস দ্রব্যের ক্রয় বাড়িয়ে দেয়। এভাবে জনগণের দুর্ভিক্ষ চলাকালীন সময়েও পুঁজিপতিদের ব্যবসায় বাজিমাত ঘটে। ১৯৩০-৩৩ সালে বিশ্বব্যাপী ভয়ঙ্কর ব্যবসা-সংকট চলাকালীন সময়ে বৃটেনের অস্টিন মোটরকার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গর্বের সাথে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাভ ঘোষণা করে। কারণ ধনীদের হাতে তখন বিস্তর টাকা, সেই টাকা যখন পুঁজি হিসেবে খাটাতে পারছিল না তখন মোটরগাড়ি কিনে ও অন্যান্য বিলাসিতায় তারা সে টাকাটা খরচ করেছিল। এর ধারাবাহিকতা সাম্প্রতিক করোনা-সংকটেও আমরা দেখতে পাই। করোনার ভয়ানক থাবায় যখন বিশ্বব্যাপী কয়েক কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত, দেশে দেশে সংকট দেখা দিচ্ছে, তখন বিশ্বের অন্যতম ইকোনমিক জায়ান্ট এমাজন এবং টেসলা গাড়ি কোম্পানির সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দশ গুণ! সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, এই মহামারীতে বড় বড় পুঁজিপতিদের সম্পদ না কমে বরং বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণে। আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ২০২০-এর মার্চে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫টি। সেপ্টেম্বরে তুমুল করোনার মধ্যে সেটা দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৪৮৮টি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া ছয় মাসের এসব তথ্য পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। ব্যাংকে টাকা বেড়ে যাওয়ার হয়তো বহু কারণ আছে। কিন্তু ৬-৭ কোটি মানুষ যদি দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকে এবং মাত্র ১-২ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্রমে সম্পদের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হতে থাকে, তাহলে সেটা কেবল অর্থনীতির বিষয় থাকে না, সামাজিক বিপদের পাটাতনও তৈরি করে।
ধনীরা আরো ধনী হয়, গরীবেরা আরো গরিব...(ব্যবসা-সংকট)
ধনীরা আরো ধনী হয়, গরীবেরা আরো গরিব...(ব্যবসা-সংকট)

কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ ট্যাক্সের প্রতিবেদনেও একই রকম ইঙ্গিত মিলেছিল। তারা এ বিষয়ে পরপর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০১৮ ও ২০১৯-এ। আর্থিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তারা বলেছিল, অতি ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ অতি এগিয়ে। ২০১৮ সালের পরের তথ্য ২০২৩ পর্যন্ত প্রক্ষেপণ শেষে তারা বলেছিল, আড়াই শ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। হারটা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, আর্থিক খাতে মোট আমানতের ৪২ ভাগই কোটিপতিদের আমানত। অর্থাৎ এমন একটি সমীকরণে পড়েছে বাংলাদেশ, যেখানে পুরো দেশ বনাম এক লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।


ধনীর সংখ্যা বাড়া সাধারণভাবে কোনো দেশের জন্য খারাপ খবর নয়। বরং প্রত্যেক মানুষকে ধনী করে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যেকোনো দেশের নীতিনির্ধারকদের। কিন্তু এ রকম লক্ষ্য বাস্তবায়নের মধ্যে যদি দ্রুত হারে কোটি কোটি মানুষ দরিদ্র হতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে কোথাও সমস্যা বেধেছে। এই সমস্যাটি কেবল অর্থনীতির ব্যবস্থাগত বিষয় নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু তথা পুজিবাদ ও আমলাতন্ত্রেরই ফল। কেননা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যদি কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে অর্থ পুঞ্জীভূত হতো, তাহলেও দেশে দারিদ্র্য এত তীব্র হয়ে উঠত না। চুইয়ে পড়ে হলেও কিছু সম্পদ সমাজের নিচুতলায় আসত।


অর্থনীতি বিষয়ের সুপরিচিত গবেষণা সংস্থা সানেম ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে অতিদরিদ্র পরিবারগুলো আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ ভাগের বেশি শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে ফেলার তথ্য দিয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, দীর্ঘমেয়াদি এক দারিদ্র্যের চক্রে ঢুকছে এই মানুষেরা। কম শিক্ষা মানেই কম মজুরি, আর কম আয়ের এক দুষ্টচক্রে ঢুকে পড়া।


পুঁজিপতিরা কখনো পুঁজি খাটানোর এই খেলায় নিজ রাষ্ট্রকে অপর রাষ্ট্র দখল কিংবা তাদের সাথে যুদ্ধেও সম্পৃক্ত করে থাকে, যা পুঁজিবাদের শেষ পরিণতি হিসেবে পরিগণিত হয়। এর ছোট্ট উদাহরণ হিসেবে বিবিসিকে দেয়া একজন নার্সের সাক্ষাৎকারের কিয়দাংশ উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন, "বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ, সেখানেই মার্কিন বাহিনীর দেখা পাওয়া যাবে। আর সেসব যুদ্ধবিধ্বস্ত জায়াগায় কিউবার লোকও থাকে। তবে তাঁরা সেনা নন, তারা চিকিৎসক।"


২০১৩ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে পুঁজিবাদের ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থাকে 'বিশ্বের সবচেয়ে অসম সমাজ' বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা। ২০১৮ সালের জরিপে দেখা যায়, আমেরিকার এই অস্থির ও নির্বান্ধব জীবনকে মেনে নিতে না পারায় জনগণের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ভয়াবহ হারে বেড়েছে। তাদের উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্রমাগত একা এবং হতাশ হয়ে যাচ্ছে, যার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ হল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটাল হিলে জনগণের ভয়ানক হামলার মাধ্যমে।


আর পুঁজিবাদের এসব নির্মম খেলার মূল ভূমিকায় আমলারা কাজ করে বিধায় সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের মাঝে আমলাতন্ত্রকে প্রধান সংযুক্তকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।


শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমলাদের অবস্থান কী হবে সেসম্পর্কে লেলিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে বলেন, "সব কর্মচারী জনতার ভোটে নির্বাচিত হবে এবং ভোটের মাধ্যমে যেকোন সময় তাকে বরখাস্ত করা যাবে। আমলাদের বেতন সাধারণ শ্রমিকের সমানই হবে, এতে সবাই আমলার কাজ করবেন এবং আমলাদের আলাদা কোন দাপট থাকবে না।" কারণ লেনিন জানতেন, একবার আমলাদের বাড়বার সুযোগ দিলে তারা দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে এমন ঐক্যবদ্ধ এক শ্রেণি সৃষ্টি করবে যে, তাদের রক্তাক্ত বিপ্লব ব্যতীত হঠানো সম্ভব হবেনা।


রাশিয়া ছাড়া চীনেও ভ্রান্ত গণবিরোধী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' সংঘটিত হয়েছিল। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব প্রশাসন থেকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোতেও দেখা যায়। সেসম্পর্কে মাও সেতুং সপ্তম কংগ্রেসের দ্বিতীয় প্লেনারিতে বলেছিলেন, "বিজয় লাভের পরপর কিছু মনোভাব পার্টিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। যেমন, ঔদ্ধত্য, স্বারোপীত বিরত্বের আবহাওয়া, অলসতা, এগিয়ে চলতে অনাগ্রহ, সুখের প্রতি আসক্তি ইত্যাদি।"


আমলাতন্ত্র শুধুমাত্র উগ্রতা কিংবা কঠোর নিয়ন্ত্রণই ছড়ায়না, কখনো কখনো এটি উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে থাকে। কারণ তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা অর্থনীতি যদি ভেঙ্গে পড়ে, তাহলে জনগণের মাঝে বিশৃঙ্খল পরিস্থতি সৃষ্টি হয়, যার ফলে তাদের শাসন কার্যক্রমের উপর জনগণের আস্থা হ্রাস পায়। আর এই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে জনগণের উপর আমলাদের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেয়ে শাসনব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে, এমনকি কখনো কখনো জনগণের রোষের মাঝেও পড়ে তারা। তাই এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকতে আমলারা সর্বদা সচেষ্ট থাকে এবং নিজ দক্ষতাবলে তারা অকাট্য নীতিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে। এভাবে আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের উন্নয়নেও ভূমিকা পালন করে থাকে।
আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা
আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা

আমলাতন্ত্র শ্রেণিসমাজের দীর্ঘদিনের সৃষ্টি, যাকে শক্তিশালী করেছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বকে ভীষণভাবে বৃদ্ধি করেছে। এইজন্যেই ভাববাদীরা আমলাতন্ত্রকে 'প্রয়োজনীয় পাপ' বলেছেন। মাও সেতুং আজীবন আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালান। মাও সেতুং ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারীতে আমলান্ত্রের ২০ ধরনের প্রকাশ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "প্রশাসন বা সংগঠনের উচ্চস্তরে থেকে আমলাতান্ত্রিক নেতারা খুব অল্প জ্ঞান রাখেন। তারা জনগণের মতামত বোঝেন না এবং পড়েন না।"


তাঁর আমলাতন্ত্রের বিশটি বৈশিষ্ট্য হল, কর্তৃত্বমূলক, রুটিনবাদী, জমিদারি, অসাধু, দায়িত্বজ্ঞানহীন, পিচ্ছিল, মেধাশুন্য, অলস, দাপ্তরিক,অকর্মা, আনুষ্ঠানিকতা, ব্যতিক্রমী, বায়বীয়, অহংকারী, বিবাদমত্ত, চক্রপন্থী, অধঃপতিত এবং প্রতিক্রিয়াশীল। মাও সেতুং আরো বলেন, "অসাধু আমলাতন্ত্র অজ্ঞ, তারা কোন বিষয় জানতে লজ্জাবোধ করে। তারা অতিরঞ্জিত করে এবং মিথ্যা বলে। তারা নিজেরা ভুলে ভরা, কিন্তু সেই দোষের দ্বায় চাপায় জনগণের উপরে। তারা তাদের উচ্চস্তরের নেতৃত্বকে ভুল তথ্য দিয়ে প্রতারণা করে।"


পরিশেষে বলা যায় যে, সম্রাজ্রবাদ দ্বারা নিপীড়িত জনগণকে রক্ষা করতে আমলাতন্ত্রের ভুলত্রুটি সংশোধন করে তাদের নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাতেই রাখতে হবে। এর মাধ্যমেই পুঁজিবাদকে রুখে দেয়া সম্ভব হবে, অন্যথায় বিশ্ব মানবতাকে ভয়ঙ্কর পরিণতি ভোগ করতে হবে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.