-->

সামরিকতাবাদ ও উন্নয়ন সম্পর্ক

এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাষ্ট্র সামরিক উন্নয়নকে রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা চালায়। বর্তমান বিশ্বের সামরিকতাবাদী দেশগুলোর দিকে

সামরিকতাবাদ হল এমন একটি বিশ্বাস, যা জাতির স্বার্থকে প্রসারিত করতে একটি শক্তিশালী সামরিক বিকাশ বজায় রাখা এবং ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করে। সাধারণত একটি সামরিকতাবাদী দেশের বৃহৎ প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকে, যা তাদের আয়ের একটি অনুপাতহীন অংশ ব্যয় করে। একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করার জন্য রাষ্ট্র তার সমাজ ও অন্যান্য সমস্ত জাতীয় স্বার্থকে, এমনকি কখনও কখনও অপর রাষ্ট্রকেও অধীনস্থ করে থাকে। সামরিকতাবাদে সরকার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনের উপাদানগুলিকে নির্দেশ দেয়


সামরিকতাবাদ ও উন্নয়ন সম্পর্ক


সামরিকতাবাদ ও উন্নয়ন
সামরিকতাবাদ ও উন্নয়ন

সামরিকতাবাদ সমরাস্ত্রের উন্নয়ন ও যুদ্ধপ্রবণতা সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মানুষ হত্যার যে সংস্কৃতি দেশগুলোর মাঝে ছড়িয়ে দেয়, তাকে জর্জ বার্নার্ড শ "মৃত্যুর শিল্পকলা" বলে অবিহিত করেছেন। এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হল ষোড়শ শতকে ইউরোপে উৎপত্তি হওয়া পুঁজিবাদ, যা আঠার'শ শতাব্দীতে অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমান  বিশ্বে সর্বাধিক শক্তিধর শাসনব্যবস্থা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আধিকাংশ বিশ্লেষকই ঐকমত্য হয়েছেন যে, জাতীয়তাবাদ এবং পুঁজিবাদই হল সামরিকতাবাদের মূল ভিত্তি, যা বর্তমান বিশ্বে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একইসাথে প্রভাব বিস্তার করছে একে অপরের সহায়ক হিসেবে।


পুঁজিবাদের অন্যতম ফল উপনিবেশবাদ ও নব্য-উপনিবেশবাদ অটুট রাখার প্রয়োজনে বর্তমানে বিশ্বের পুঁজিবাদী শক্তিগুলো "মৃত্যুর শিল্পকলার" অভাবনীয় সমৃদ্ধি ঘটিয়ে চলছে। এভাবেই পুঁজিবাদ সরাসরি সামরিকতাবাদের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখছে প্রতিনিয়ত।


এই পর্যন্ত সংঘটিত বিশ্বের দুটি বৃহৎ হত্যাযজ্ঞ তথা বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে সামরিকতাবাদকে উল্লেখ করা হয়। পাঁচটি প্রধান ইউরোপীয় অর্থনৈতিক শক্তি - জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং গ্রেট ব্রিটেন - তাদের সম্পদ তৈরির জন্য সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভর করেছিল। তারা মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে যে দেশগুলি জয় করেছিল তাদের থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করেছিল। যখন তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী এই উপনিবেশগুলো গ্রহণ করেছিল তখন তারা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। একই সময়ে, পোল্যান্ডের মতো দেশ যারা তাদের স্বাধীনতা চেয়েছিল তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ বাড়ছিল, যখন শান্তি বজায় রাখতে জাতিসংঘ বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার মতো কোন সংঘটন ছিল না । ফলস্বরূপ দেশগুলো দ্বিপাক্ষিক চুক্তিসমূহের উপর নির্ভর করেছিল যা প্রায়শই অন্যান্য চুক্তিগুলোর সাথে বিরোধী হয়। এর প্রেক্ষিতে এই শক্তিগুলো অনুভব করেছিল যে তাদের একমাত্র সুরক্ষা হল শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।


সামরিকতাবাদ
সামরিকতাবাদ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষপ্রান্তে সংঘটিত সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিপ্লবের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে গণচীন সহ বিশ্বের অনেক দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পুঁজিবাদের চিরশত্রু সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা রুখতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পুঁজিবাদী দেশগুলো সংকল্পবদ্ধ হয়, যা দেশগুলোর সামরিকীকরণকে আরো বেগবান করে। এর মোকাবেলায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মাঝেও সামরিকতাবাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, ফলস্বরূপ দুই মেরুতেই প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। তবে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় সামরিক উন্নয়ন ততোটা প্রাধান্য পায়না বলে পুঁজিবাদী শক্তিগুলো সামাজতান্ত্রিকদের পূর্ণমাত্রায় সামরিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি কৌশলি পদক্ষিপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে, তারা মহাকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে, যেখান থেকে পৃথিবীর যেকোন স্থানে আঘাত করা সম্ভব। এই ঘোষণা শুনে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন করে বিশাল বাজেট প্রণয়ন করল মহাকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নে। পরিশেষে কয়েক দশক পর এই গুজব সৃষ্টির তথ্য ও কারণ উন্মোচিত হয়।


সাধারণত সামরিকতাবাদে রাষ্ট্রীয় পুঁজির উদ্বৃত্ত অংশ থেকে সমরাস্ত্র উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে গবেষণার দ্বারা নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সাহায্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। ফলে যে বিনিয়োগ উক্ত খাতে করা হয়, তার তুলনায় ঢের বেশি মুনাফা উঠে আসে, যা পূণরায় বৃহৎ বিনিয়োগের পথ সুগম করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা রাষ্ট্রের বেকারত্ব দূরিকরণে ভূমিকা রাখে বৈকি। তাছাড়া উৎপাদিত, আবিষ্কৃত সমরাস্ত্র বিক্রি করেও ব্যাপক মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়। এভাবে অন্যান্য ব্যবসায়ের ন্যায় সমরাস্ত্র তৈরির এই প্রক্রিয়ায়ও ব্যাপক মুনাফা অর্জন সম্ভব হওয়ায় এটি পুঁজিবাদীদের পুঁজির একটি অন্যতম সঞ্চয়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও সমরাস্ত্র উৎপাদন 'রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা উন্নয়ন' নামক কাল চাদরে ঢাকা থাকে বলে এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা মিলে এবং রাষ্ট্রই তার অর্জিত অর্থের মাধ্যমে এসব উৎপাদিত অস্ত্র ক্রয় করে থাকে। আর পুঁজিপতিদের নিকট উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্যই যেহেতু মুনাফা অর্জন, তাই উৎপাদিত পণ্য অস্ত্র নাকি খাবার, মানুষের জীবন রাক্ষা করবে নাকি হরণ করবে তা তাদের নিকট বিবেচ্য নয়। সুতরাং এর থেকে বোঝা যায় যে, সামরিক উৎপাদন ও সামরিকতাবাদ স্বাভাবিক পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সেক্ষেত্রে যদি আমরা বর্তমানে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর পুঁজির সঞ্চায়ন, ব্যাপক বিনিয়োগ ও এর থেকে মুনাফা অর্জনকে উন্নয়ন বলি, তবে সামরিকাবাদ উন্নয়নের একটি মাধ্যম বা বাহক। আর তাই বিশ্বের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ ও পুঁজিপতিদের নিকট সামরিকতাবাদ একটি গ্রহণযোগ্য উন্নয়নমূলক শাসনব্যবস্থা।



সামরিকতাবাদের ধারক ও বাহকখ্যাত পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার শেষ যে পরিণতি, তা হলো যুদ্ধ। পুঁজিবাদীরা নিজ দেশে পুঁজি খাটানোর ক্ষেত্র খুঁজে না পেয়ে একসময় অনুন্নত গরীব রাষ্ট্রগলোকে দখল করার পাঁয়তারা করে। আধুনিক যুগে উপনিবেশবাদ না থাকলেও নব্য-উপনিবেশবাদ আছে, আর এই দুটির মূল উদ্দেশ্যই বাজার দখল করা। পুঁজি খাটানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত দখল কার্যক্রমে যখন অপর পুঁজিবাদী শক্তি বাগড়া দেয়, তখন উভয় পক্ষের দ্বন্দ্ব যুদ্ধে রূপ নেয়, যা দ্বন্দ্বের কারণ অনুন্নত দেশটিকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। আর তাই যুদ্ধে জয়লাভ ও শক্তিশালী দখদার সাজতে বিশ্বশক্তিগুলো সামরিক উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু এই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হল জনগণ থেকে দেশের উন্নয়নের নামে নেয়া কর। তাই করের অর্থ খাটানোর নৈতিকতা ও যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে সরকারগুলো পত্রিকা, ম্যাগাজিন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর চাপ সৃষ্টি করে জনগণকে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও যুদ্ধপ্রবণ করে তোলে। অন্যথায় যারা প্রকৃত খবর, সরকারবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চায়, তাদের শক্ত হাতে দমন করে।



এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাষ্ট্র সামরিক উন্নয়নকে রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা চালায়। বর্তমান বিশ্বের সামরিকতাবাদী দেশগুলোর দিকে তাকালেই এর সত্যতা বুঝতে পারব আমরা। বিশ্বের সর্বশেষ পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ায় নাগরিক জীবন এতটাই কষ্টকর যে, প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ দক্ষিণ কোরিয়ায় পালিয়ে যান বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। অপরদিকে উদীয়মান সামরিক শক্তি ইরানেরও একই অবস্থা। দেশে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, দুর্নীতি সহ নানা সমস্যা প্রতিনিয়ত বেড়ে চললেও তুরস্ক, ইরান ও পাকিস্তানের সরকার সমূহ পরামণু কর্মসূচিসহ নানা সামরিক উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে যাচ্ছে। আর এই সামরিক উন্নয়নে জনগণের সমর্থন পেতে তারা যুদ্ধে শহীদ নেতৃবৃন্দের প্রতিশোধ, শত্রুদের অবৈধ অবরোধ আরোপ ও উগ্রতাকে কাজে লাগায়।
উন্নয়ন সম্পর্ক
উন্নয়ন সম্পর্ক

এই মুহূর্তে সামরিকতাবাদের সর্ববৃহৎ পৃষ্টপোষক শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালেই আমরা এর উপযুক্ত উদাহরণ পেয়ে যাব। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের তীব্র দারিদ্র্য ও মানবাধিকার বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, চীন, সৌদি আরব, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স ও জাপান সম্মিলিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তা খাতে যত অর্থ ব্যয় করে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী উন্নত বিশ্বের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ওই সময় বিশদ তথ্য দিয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি আমেরিকার সমাজব্যবস্থাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে অসম সমাজ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকায় অন্তত চার কোটি মানুষ দরিদ্র। সেখানে মৃত্যুহার বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিরতা ও নেশার কবলে পড়ে বহু পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, এই সবকিছুর পেছনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।


আমেরিকান সমাজে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। এই সমাজের একটি বিরাট অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। অর্থ আর মুনাফা অর্জনের সীমাহীন নেশা এখানকার মানুষের জীবনকে এতটাই অস্থির করে তুলছে যে বহু মানুষের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই এই সমাজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর ২০১৮ সালের জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার এই অস্থির ও নির্বান্ধব জীবনকে মেনে নিতে না পারায় সমগ্র দেশের মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে।


সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নব্য উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্রমাগত একা হয়ে যাচ্ছে, ছুটে যাচ্ছে পারস্পরিক বন্ধন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই নিষ্ঠুর নিঃসঙ্গতা মানুষের জীবনে হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ ভোগবাদী জীবনের অস্থিরতার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিষণ্ণতা থেকে আরোগ্যলাভের জন্য সেখানে ‘বিষমিশ্রিত’ বিশাল বিশাল ওষুধ কোম্পানি খোলা হচ্ছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলারের মুনাফা তুলে নিলেও দিন শেষে বিষণ্ণ মানুষগুলোর জীবনে প্রাণখোলা হাসি–আনন্দ আসছে না।


মার্কিন পুঁজিবাদ শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বা আশপাশের দেশের মানুষের পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধনের জন্য হুমকি, তা নয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ভোগবাদী সমাজ সম্প্রসারণের কারণে পণ্যের অতি ব্যবহার, অপব্যবহার ও বিষক্রিয়া বাড়ছে। এটি গোটা পৃথিবীকে এমন এক ধ্বংসের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব হবে না। ১৯৮৯ সালের আগে মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, অধিক ভোগ ও উৎপাদন প্রবণতার কারণে গ্রিনহাউস ইফেক্ট বা কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। পুঁজিবাদ যত বেশি বিকশিত হবে, এই ধারা তত বাড়তে থাকবে। ক্রমেই পৃথিবী ধ্বংসের দিকে যেতে থাকবে।


এক্সট্রিম সিটিজ: দ্য পেরিল অ্যান্ড প্রমিজ অব আরবান লাইফ ইন দ্য এজ অব ক্লাইমেট চেঞ্জ বইয়ের লেখক অ্যাশলে ডওসোন গত ডিসেম্বরে ভারসো বুকস ওয়েবসাইটে লেখা একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘উগ্র পুঁজিবাদ’ এবং ‘পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভকে অপরাধ সাব্যস্ত করার চেষ্টা’ দিয়ে গোটা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অ্যাশলে ডওসোন বলছেন, ট্রাম্প নিজেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। এ থেকে তিনি বের হতে পারবেন না। আমেরিকাও বের হতে পারবে না।
পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে এই ধনতান্ত্রিক অস্থির সমাজকে ভাঙতেই হবে। বিশ্বকে জাগতেই হবে।


যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিকায়ন জোরদার হয় মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। এই মহাযুদ্ধের পর তারা উপলব্ধি করল যে যুদ্ধটি লাভজনক ছিল। এর প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে তারা প্রতিরক্ষা খাতে চীন ও রাশিয়াকে ছাপিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি সরবরাহ শুরু করল। এরপর ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যানরি ট্রুমান এই লাভজনক যুদ্ধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তিন বছরব্যাপী চলা কোরিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে। এর সাথে সাথে প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকির পাশাপাশি করমুক্ত বাণিজ্য ও গবষণায় সরকারি সহায়তাও দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত বিশ্বে মাল্টিরোল ফাইটার জেট ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্বে থাকা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নির্মাতা লকহিড মার্টিন কোম্পানি তাদের মুনাফার ৬০ ভাগই সরকারি অংশিদারিত্ব থেকে অর্জন করে থাকে। এছাড়াও অপর বিমান নির্মাতা জায়ান্ট বোয়িঙও একইভাবে সামরিকায়নের ফলভোগী অন্যতম বৃহৎ উদাহরণ।


১৯৬১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহোয়ার তাঁর বিদায়ী ভাষণে মার্কিন সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছিলেন, অস্ত্রসরবরাহকারী শিল্পগুলো জাতীয় স্বার্থকে হুমকির সম্মুখীন করতে পারে। এটি অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্য খাতকে ব্যয়ের দিক থেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অবকাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। সর্বশেষ গতবছর ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাজেটের জন্য ৭৫০ বিলিয়ন ডলার চেয়ে বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। এটি মোট বাজেটের ১৬ ভাগ যা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের তিন গুণ। ফলস্বরূপ এই সামরিক বাজেটের অঙ্কটি দশটি দেশের সম্মিলিত অঙ্কের চেয়ে বেশি।


তবে সামরিকতাবাদের এই বিপুল ব্যয় বেকারত্ব হ্রাসেও ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামরিকায়নের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যক্রমকে অন্যান্য খাতের সাথে তুলনা করলে এর প্রকৃত উন্নয়ন উঠে আসবে। ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিরক্ষা খাতে খরচ হওয়া এক বিলিয়ন ডলার ৮,৫৫৫ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। তবে এই এক বিলিয়ন ডলার রাস্তা, সেতু এবং অন্যান্য জনসাধারণের কাজে ব্যয়ে ১৯,৯৭৫ টি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। একই পরিমাণ শিক্ষা খাতে ব্যয়ে ১৭,৬৮৭ জনের কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছে। ৯/১১ এর পর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ব্যয় হয় ২.৪ বিলিয়ন ডলার, সৃষ্টি হয়েছে ২০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান, কিন্তু এই ব্যয় যদি শিক্ষা খাতে হত তবে ৪২ মিলিয়ন কর্মসংস্থান এবং ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যুক্ত করতে পারত, যার ফলস্বরূপ ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা মার্কিনিরা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারত।



সামরিকতাবাদী শক্তিগুলো শুধুমাত্র নিজেরা সামরিকায়ন করেনা, বরং তার সহযোগী মিত্রদের সামরিকায়ন তদারকি করে থাকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত রাখতে। এর সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বশেষ উদাহরণ হল রাশিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ ক্রয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির ঘটনা। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সর্বোৎকৃষ্ট রাশিয়ান এই সিস্টেম কিনতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে অস্ত্র বাজারে নিজ আধিপত্য ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই সিস্টেম ক্রয় করাতে তুরষ্ক মার্কিন অস্ত্র অবরোধের মুখে পড়ে এবং তাদের সাথে করা সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ বিক্রয় চুক্তি বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র।


উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, সামরিকতাবাদ শুধু নিজ দেশেই সামরিকায়ন ও পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করেনা, বরং বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সম্রাজ্যবাদকে প্রসারিত করার মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে দ্রুততর ধ্বংসের পদ্ধতি আবিষ্কারে ভূমিকা রাখে। আপাত দৃষ্টিতে সামরিকতাবাদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও মূলত তা মন্দের ভাল হিসেবেই কাজ করে থাকে। কেননা একই পুঁজি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিন্ন খাতে কয়েক গুণ বেশি উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয়। তাই উন্নয়নের স্লোগান তুলে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী শক্তিগুলো দেশ ও জাতির মাঝে যে সামরিকায়ন সৃষ্টি করছে, তা অনতিবিলম্বে বন্ধ করে বিশ্ব মানবতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.