-->

মুসলিম নির্যাতনে চীন অগ্রসরমান

চীন ভালভাবেই জানে, যুক্তরাষ্ট্র উইঘুর নির্যাতনকে একটি ইস্যু বানিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধ পরিচালনা করছে এবং এতে সহানুভূতি পেতে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বুলি

সাম্প্রতিক বিশ্বে জাতিগত নির্যাতনের যেসব জলন্ত উদাহরণ বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত হয়েছে, তন্মধ্যে সর্বাধিক সমালোচিত ও জাগরণ সৃষ্টিকারী উদাহরণ হলো চীনের উইঘুর সংখ্যালঘু নির্যাতন। চীন সরকারের ৩৬টি জনগোষ্ঠীর উপর চালানো গোয়েন্দা কার্যক্রম ও দমন-পীড়নের সর্বাধিক শিকার হলো চার হাজার বছরের ইতিহাসধারী উইঘুর সম্প্রদায়। মধ্যযুগে তাং সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর বর্তমানের শিনজিয়াং নামকরণকৃত পূর্ব তুর্কিস্তানে ইসলাম ও আরবীয় প্রভাব বৃদ্ধি পেলে এই উইঘুর জাতিগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে।

মুসলিম নির্যাতনে চীন অগ্রসরমান


১৯১১ সালে বাংলাদেশের চেয়ে বার গুণ বড় পূর্ব তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হলেও স্বাধীনচেতা উইঘুরদের শাসক গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এই সময়কালে তথা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রাচীন এই গোষ্ঠী বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। বহির্বিশ্বে নিজেদের একক সত্তা তুলে ধরার লক্ষ্যে ১৯২১ সালে উজবেকিস্তানে এক সম্মেলনের পর উইঘুররা এই পুরনো পরিচয় ফিরে পায়। এর প্রভাবে তারা ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে চীনা শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে অনতে সক্ষম হয়। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি উইঘুরদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শিনজিয়াং প্রদেশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নামমাত্র স্বায়ত্তশাসন জারি করে। এরপর থেকে শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দমন-পীড়নের নির্মম অধ্যায়।


পূর্ব তুর্কিস্তান তথা বর্তমান শিনজিয়াঙে উইঘুর বিলুপ্তির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সেখানে সরকারিভাবে ব্যাপক হারে হান চীনাদের পুনর্বাসন শুরু করা হয়। এই পুনর্বাসনের হার এতই বেশি ছিল যে, ১৯৪৯ সালে উক্ত অঞ্চলে যেখানে ৯৫ শতাংশ উইঘুর ছিল, সেখানে ১৯৮০ সালের মধ্যেই তা ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ২০১৬ সালে "ফ্যামিলি মেকিং" নামে একটি উদ্যোগ চালু করে ক্ষমতাসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। এই আইনের আওতায় প্রতি দুইমাসে কমপক্ষে পাঁচ দিন উইঘুর পরিবারগুলোতে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের অতিথি হিসেবে থাকতে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ পার্টির সদস্যদের বিরুদ্ধে নারীদের সম্ভ্রমহানী ও শিশুদের নির্যাতনের অভিযোগ উঠে। এছাড়াও সেখানে চলছে বৌদ্ধ নারীদের সাথে মুসলিম যুবক ও মুসলিম নারীদের সাথে বৌদ্ধ পুরুষদের জোরপূর্বক বিবাহ প্রদানর মত কার্যক্রম। এহেন ঘৃণ্য প্রক্রিয়ার দরুন বর্তমানে শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের সংখ্যা ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুকের তথ্য মতে, বর্তমানে শিনজিয়াঙে মোট ১ কোটি ২০ লাখ উইঘুর বসবাস করছেন। জেনজের প্রতিবেদন অনুসারে উইঘুরদের এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কারণ হলো উইঘুর নারীদের জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানো, বন্ধ্যাকরণ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি, স্টেরিলাইজেশন সার্জারি, জন্মনিয়ন্ত্রক ইনজেকশন ও ওষুধ সেবন করানো ইত্যাদি।
উইঘুর আন্দোলনে একজন নারী
উইঘুর আন্দোলনে একজন নারী

শি জিনপিং প্রশাসনের অসহনীয় অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে উইঘুররা ১৯৮৮ সালে "পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি" গঠন করে। এই সাংগঠনিক কর্মসূচিকে ভেস্তে দিতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি একটি অভ্যন্তরীণ গোলযোগ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ১৯৯০ সালে ভয়াবহ দাঙ্গায় রুপ নেয়, ফলে চীন সরকার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অজুহাতে পরিকল্পিতভাবে উক্ত অঞ্চলে ব্যাপক ধর-পাকড় ও হত্যাযজ্ঞ চালায়, এরপর থেকে এখন পর্যন্ত উইঘুররা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। তাদেরকে নিজ দেশেই পরিণত করা হয়েছে শরণার্থীতে, নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ, পুরো অঞ্চলব্যাপী নিশ্ছিদ্র গোয়েন্দা নজরদারী, করা হয়েছে বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তাদের খবর নিতেও কোন সংবাদকর্মী প্রবেশ করতে পারেনা উক্ত অঞ্চলে। অনলাইনে শিনজিয়াঙের যতগুলো ভিডিও পাওয়া যায় তার প্রতিটিতেই দেখা যায়, প্রত্যেক রাস্তায় দশ গজ পরপর রয়েছে ক্যামেরা, তিন থেকে চার স্তরের নিরাপত্তা কর্মী। কারো গতিবিধি সামান্য সন্দেহজনক হলেই ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ভয়ানক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। আর এই ক্যেম্পের ভয়াবহতার ধারণা বিবিসির প্রতিবেদন, পলাতক উইঘুর তুরসুনে জিয়াউদুন, কাজাখ নারী গুলজিরা আউয়েলখান, ‘এসকেপ ফ্রম চায়না’স মডার্ন-ডে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ গ্রন্থের সহলেখক সায়রাগুল সাউতবে'র বক্তব্যে পাওয়া যায়।


শি জিন পিং প্রশাসনের এই উইঘুর বিলুপ্তিকরণকে কানাডা গত বছরের ২১ অক্টোবর "গণহত্যা" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এর কিছুদিন আগে ৬ অক্টোবর জাতিসংঘে বিশ্বের ৩৯টি দেশ একযোগে চীনের উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের নিন্দা জানায়। এছাড়াও উইঘুর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা দিলেও চীনের জাতিগত আগ্রাসী আচরণ বন্ধ হয়নি।
উইঘুর আন্দোলন
উইঘুর আন্দোলন

এত নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দার পরেও চীনের ইতিহাসের কুখ্যাত এই জাতিগত নির্যাতন কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো খোদ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নিরবতা এবং সুর মেলানো। চীন ভালভাবেই জানে, যুক্তরাষ্ট্র উইঘুর নির্যাতনকে একটি ইস্যু বানিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধ পরিচালনা করছে এবং এতে সহানুভূতি পেতে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বুলি আওড়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। এর অন্যতম প্রমাণ হলো, উইঘুরদের চিহ্নিত করার জন্য ডিএনএ সংরক্ষণ করার যে অত্যাধুনিক ডাটাবেজ চীন তৈরি করছে, সেই কার্যক্রমে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই প্রযুক্তিগত ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিএনএ সংগ্রহের সকল যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেখানকার বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীও নিয়োগ দিয়েছে চীন সরকার। মূলত আমেরিকার দুইটি প্রতিষ্ঠান চীনকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এদের একটি হলো ম্যাসাচুসেটসের 'থার্মো ফিশার', আর অন্যটি হলো সান ডিয়েগোর 'ইলুমিনা'। সিসিআইডি কনসাল্টিং নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, চীনে ডিএনএ সামগ্রীর বাজার প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যেটা দ্বিগুণ হতে পারে। আর চীনের বিশাল এই বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে থার্মো ফিশার ও ইলুমিনা। ল্যাবের যন্ত্রপাতি, ডিএনএ পরীক্ষার কিট থেকে শুরু করে ডিএনএ ম্যাপিং প্রযুক্তি, সবই যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই কোম্পানি থেকে আমদানি করছে চীন। আর এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করছে থার্মো ফিশার ও ইলুমিনা। ২০১৭ সালে মোট ২০.৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে থার্মোফিশার, যার ১০ ভাগই এসেছে চীন থেকে। তাদের প্রায় ৫,০০০ কর্মী বর্তমানে চীনে নিয়োজিত রয়েছে। তাই জাতিগত নির্যাতনের বিপক্ষে মার্কিন কন্ঠস্বর কী উদ্দেশ্যে, কতদিন শোনা যাবে তা চীন ভালভাবেই জানে।
উইঘুর আন্দোলন
উইঘুর আন্দোলন

এদিকে একমাত্র মুসলিম পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান মাঝে মাঝে কাশ্মীর, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বললেও চীনের উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে কখনো টুঁ শব্দটি করেনা। অপর উদীয়মান শক্তিধর রাষ্ট্র ইরানও বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যায় মুসলিমদের পক্ষে হুঙ্কার ছাড়লেও চীনের এই ঘৃণ্য কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কথা বলেনা। এছাড়া আরব বিশ্ব এবং ওআইসি'কেও এই ব্যাপারে সর্বদা নিরব ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। উল্টো উইঘুর নির্যাতনে সমর্থন দিয়ে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান চীন সফরে গিয়ে বলেন, "জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ‘উগ্রবাদ প্রতিহত করা’ ও ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের অধিকার বেইজিংয়ের রয়েছে।"


মুসলিম বিশ্বের অন্যতম কর্ণধার তুরষ্ক ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উইঘুর নির্যাতন ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বন্ধের জোর দাবি জানায়। এরপর তাদের আর তেমন সক্রিয়তা চোখ পড়েনি। বরঞ্চ সম্প্রতি তুরষ্ক ভেকসিন রাজনীতির শিকার হয়ে সেখানে আশ্রয় নেয়া কিছু উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠাতে পারে বলেও গুজব উঠে। এর প্রেক্ষিতে এই মাসের প্রথম সপ্তাহে তুরষ্কে চীনা দূতাবাসের সামনে উইঘুরদের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি বিশ্বের ১৮০টি মানবাধিকার সংগঠন চীনের উইঘুর নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০২২ সালে চীনে অনুষ্ঠিতব্য শীতকালীন অলিম্পিক গেমস বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে।
উইঘুর আন্দোলন
উইঘুর আন্দোলন

চীনের এহেন ঘৃণ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনকে অচিরেই বন্ধ করতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বানে বিশ্বসভ্যতার সাড়া দেয়ার কোন বিকল্প নেই। অন্যথায় চীন এই দমন-পীড়ন নিজ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে বিস্তৃত করবে, যার প্রমাণ মিয়ানমারের 'রোহিঙ্গা গণহত্যা' ও জান্তা সরকারের অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল কার্যক্রমে চীনের সমর্থনের মাধ্যমে পেয়েছি আমরা। তাই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে জাতিগত নিধন-নির্যাতন দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে সকলের এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.