-->

যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোটের তৎপরতা

বলেছেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পলিসির কারণে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক নিয়ে এই জোট হচ্ছে এবং ভারতকে বাইরে রাখা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বকে নেতৃত্বদানকারী শ্রেষ্ঠ পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিযোগি তথা উদীয়মান শক্তিগুলোকে দমন করতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব অদূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রেক্ষিতে তৈরি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শক্তিশালী জোট। বিশ্বে মার্কিন আগ্রাসি তৎপরতার শিকার রাষ্ট্রের সংখ্যা অনেকগুলো হলেও ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা কিছু উদীয়মান শক্তি মার্কিনবিরোধী এক শক্তিশালী জোট তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোটের তৎপরতা


গত মাসে অনুষ্ঠিত তুরষ্কের ইস্তাম্বুলে ইকোনমিক কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ইকো) এর পরিবহন ও যোগাযোগ বিভাগের ১০তম বৈঠকে তুরষ্ক-ইরান-পাকিস্তানে সাড়ে ছয় হাজার কিলোমিটারব্যাপী রেল চলাচলের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। ইরানে ২৬০০, তুরষ্কে ১৯৫০ ও পাকিস্তানে ১৯৯০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই রেল লাইন (টিআইটি) চীনের উইঘুর অধ্যুষিত জিনজিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত যাবে বলে খবর প্রকাশ করে জাপানি নিউজ ম্যাগাজিন নিক্কি এশিয়া'য়। তুরষ্ক থেকে ইসলামাদে পৌঁছতে যেখানে ২১ দিন সময় লাগত, সেখানে এই রেলপথের মাধ্যমে মাত্র ১০ দিনে পৌঁছা যাবে।
.
.
পৃথিবীর মোট পরিধির এক-ষষ্ঠাংশ বিস্তৃত এই রেলপথ চায়না পাকিস্তান ইকনোমিক করিডোর (সিপেক) এর সর্ববৃহৎ প্রকল্প এমএল-১ এর সাথে সংযুক্ত হয়ে চীনের জিনজিয়াঙে প্রবেশ করবে বলে পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার উদীয়মান ত্রিশক্তির হঠাৎ ইকো সচলে তৎপর হওয়াকে পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে চীন তার স্বপ্নের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পে যুক্ত করে নিচ্ছে উপযুক্ত সময়ে। উল্লেখ্য যে, রেলপথটিতে ২০০৯ সালেই ত্রিশক্তি পরীক্ষামূলক কন্টেইনার ট্রেন চালু করেছিল, ফলে এই রুট বাস্তবে রূপ পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোট
যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোট


এছাড়াও ইরানের কৌশলগত চাবাহার বন্দরের উন্নয়নকাজে মার্কিন চাপে ভারতের গড়িমসির কারণে ইরান ভারতকে কাজ থেকে বহিস্কার করে চীনকে সম্পূর্ণ কাজ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রকল্পে বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি বন্দরের সাথে মূল শহরগুলোর রেল সংযোগ স্থাপনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও ইতোমধ্যেই চীন ইরানের সাথে করা ২৫ বছরের 'কৌশলগত সহযোগিতা' চুক্তির আওতায় ৪০ বিলিয়নেরও বেশি বিনিয়োগের কর্মযজ্ঞ শুরু করে দিয়েছে। চীনের প্রধান লক্ষ্য, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর, ইরানের চাবাহার বন্দর ও টিআইটি'র মাধ্যমে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত বিআরআই বিস্তৃত করে সেখানকার বাজারে প্রভাব বৃদ্ধি করা।
.
.
ডিসেম্বরের ২৭ তরিখ পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইরানের জাতীয় সংসদের স্পীকার ড• লারিজানি সবার সামনে ইরান-তুরষ্ক-রাশিয়া জোটকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন, একইসাথে এই জোটে যোগ দিতে পাকিস্তান ও চীনকে আহ্বান জানান। তিনি আফগানিস্তানে মার্কিনিদের দুই দশকের ব্যর্থতার বিপরীতে তাদের জোটের সিরিয়ার সফলতা উল্লেখ করেন। এতে বোঝা যায়, তিনি আফগানিস্তানে মার্কিনিদের পর তার জোটের কার্যক্রম শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কারণ চীন তার উচ্চাভিলাষী বিআরআই প্রকল্পে আফগানিস্তানকে সংযুক্ত করতে আপ্রাণ চালাচ্ছে, কেননা আফগানিস্তান অশান্ত থাকলে এর প্রভাব বিআরআই, সিপেকসহ জিনিজিয়াং প্রদেশে পড়বে, যা চীন কখনো চায়না। অপরদিকে মার্কিন-তালেবান বৈঠকে পাকিস্তান তার কার্যকারিতা দেখিয়েছে ইতোমধ্যেই, যার ফলস্বরূপ ট্রাম্প "ভারতের এখানে কোন কাজ নেই" বলে ভারতের ভূমিকাকে খারিজ করে দিয়েছেন।
.
.
ইরান-পাকিস্তান-চীনের কাজে নামার পরিকল্পনা আঁচ করতে পেরেই ভারত আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সরানোর বিরোধীতা করছে, কেননা মার্কিন সেনা থাকলে কাশ্মীরে চীন-পাকিস্তানের হামলায়ও কাজে কাজে লাগতে পারে। এছাড়াও কাশ্মীর ইস্যু এবং মার্কিন তাবেদারির কারণে ইরান-ভারত সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে, যা রক্ষা করতে ভারত দুইজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে তেহরান পাঠায়।
যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোট
যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোট

 এরপরেও মার্কিন চাপ এবং ইরানের অসম্মতির কারণে ইরান-পাকিস্তান-ভারত ত্রিদেশীয় 'শান্তির পাইপলাইন' প্রকল্প থেকে ভারত ছিটকে পড়েছে। রাশিয়ার ডিফেন্স অ্যানালিস্ট মাইকেল বরিস পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পলিসির কারণে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক নিয়ে এই জোট হচ্ছে এবং ভারতকে বাইরে রাখা হচ্ছে।’ ভারতের সাথে কোনো পড়শির সুসম্পর্ক নেই। বরিস আরো জানান, 'মূলত মোদির রেসিস্ট পলিসি এই জোট গঠনের পিছনে কাজ করেছে। চীন সিপেক'কে সার্থক ও কার্যকর করার জন্য সব কিছুই করবে। ভারত বাঁধা দিয়ে কোনো কূলকিনারা করতে পারবে না বরং অপদস্থ হবে। যেমনভাবে ইরানের রেল প্রকল্প থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।'
.
.
পাইপলাইন প্রকল্পে ইরান অংশের কাজ শেষ, এখন পাকিস্তানে শুরু হবে। ইরান-পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান এই সম্পর্কে ফাটল ধরাতে ভারতের ইন্ধনে বেলুচিস্তান বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলো দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের উপর হামলা চালায়, কিন্তু ফল হলো বিপরীত। ইরান-পাকিস্তান মিলে যৌথ বাহিনী গঠন করে এখন একসাথে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এতে চীনেরও সর্বোচ্চ সহযোগিতা আছে, কারণ এই সীমান্তের স্থিতিশীলতা বিআরআই ও সিপেক প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
.
.
রাশিয়ার সাথে ইরানের দীর্ঘ সম্পর্ক ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়া ও পাকিস্তান ২০১৫ সালের নর্থ-সাউথ গ্যাস পাইপলাইন প্রজেক্ট চুক্তি সম্প্রসারিত করেছে, যা রাশিয়ান কোম্পানিগুলোর জন্য পাকিস্তানের বাজার খুলে দেবে। এছাড়াও ২০১৮ সাল থেকে যৌথ মহড়ার জন্য রাশান সেনা অবস্থান করছে পাকিস্তানে এবং সম্প্রতি রাশিয়া-পাকিস্তানের যুগান্তকারী সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার কারণে মার্কিন চাপের সম্মুখীন হয়ে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে পাকিস্তান।
.
.
এই জোটের ফলে তুরষ্ক ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলার পাশাপাশি দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় অস্ত্র এবং পণ্যের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারিত করতে পারবে। এর ফলে চীনের নেতৃত্বে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (আরসিইপি) ও বিআরআই দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, যা এতদঅঞ্চলে ভারত এবং বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে। এর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে; বিশেষ করে ইরান ও চীনের কাছে মার্কিন 'ডলার সন্ত্রাস' ও অবৈধ নিষেধাজ্ঞা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।
.
.
এখন দেখার বিষয়, পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আলী হোসাইনির 'সোনার আংটি' খ্যাত রাশিয়া-তুরষ্ক-ইরান-পাকিস্তান-চীন জোটকে কিভাবে সামাল দেয় মার্কিন মুল্লুকের নতুন কর্ণধার জো বাইডেন।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.