-->

সোলেমানি হত্যার এক বছরে ইরানের অবস্থান

সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি পাল্টে দেয়া ইরানি সমরবিদ কাশেম সোলেমানি হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ কী পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান!

সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি পাল্টে দেয়া ইরানি সমরবিদ কাশেম সোলেমানি হত্যার এক বছর পূর্ণ হল গত ৩ জানুয়ারি। সিরিয়া থেকে আইএস নির্মূলের এই মহানায়কের মৃত্যুর এক বছরে ইরান প্রতিশোধ স্বরূপ কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা হিসেব করার সময় এসেছে। আর হিসেবের খাতা খোলা হবে বিধায়-ই এক বছরপূর্তিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী নিয়েছে সতর্কতা, পাঠিয়েছে অত্যাধুনিক বোমারু বিমান।

সোলেমানি হত্যার এক বছরে ইরানের অবস্থান

.
সোলেমানি হত্যার প্রধান বদলা হিসেবে ইরানের মূল ঘোষণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিতাড়িত করা। এর প্রধান ভিত্তি হিসেবে ইরাকে মার্কিনিদের অবস্থান নড়বড়ে করতে গত বছর থেকে উঠেপড়ে লেগেছে ইরান। এরপর ইরান মদদপুষ্ট এমপিদের চাপে ইরাকের পার্লামেন্টে পাশ হয় ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিল। আর মাঠ পর্যায়ে তথা মার্কিন দূতাবাসে শুরু হয় কিছুদিন অন্তর অন্তর মিসাইল হামলা। এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে সি-র্যাম মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করে। উল্লেখ্য যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বেষ্টিত দূতাবাসের নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ এর নভেম্বর পর্যন্ত ইরাকে মার্কিন দূতাবাসে মোট ৯০ টি রকেট হামলা হয়।[সূত্র:এএফপি]
এরপর সর্বশেষ গত ২১ ডিসেম্বর তিনটি রকেট দূতাবাস এলাকার অভ্যন্তরে এবং বাকিগুলো বাইরের আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। আচমকা এসব হামলার কারণে ২০২০ এর সেপ্টেম্বরে মার্কিন পররাষ্টরমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরাক থেকে মার্কিন দূতাবাস এবং সৈন্য সরিয়ে নেয়ার কথা বলেন। অপরদিকে সিরিয়ায়ও গত এক বছরে মার্কিন বাহিনী দিন দিন আরো কোণঠাসা হয়েছে, তাদের তেল চুরি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।
.
.
উপর্যুক্ত ঘটনাবলী থেকে বোঝা যায় যে, সোলেমানির মৃত্যুর মাধ্যমে ইরানের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং কার্যক্রমে যে ভাটা পড়বে বলে মার্কিনিরা আশা করেছিল, তা আদতে হয়নি; বরঞ্চ সোলেমানির মধ্যপ্রাচ্য নীতি যে সঠিক পথে আছে তা জেনে ইরান সেই নীতি প্রণয়নে আরো বেগবান হয়েছে। সোলেমানি সিরিয়া ইরাক ছাড়াও লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীদের যেভাবে শক্তাশালী করেছে, সেই ধারা এখন ইরান আরো বেগবান করেছে; বিশেষ করে যখন আরব রাষ্ট্রগুলো ইজরায়েলের সাথে হাত মেলাচ্ছে। গত মাসে আল-জাজিরাকে দেয়া এক স্বাক্ষাৎকারে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, "গত এক বছরে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং ইজরায়েলের প্রতিটি স্থান আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে।" এছাড়াও আরব রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বাসঘাতকতার বিপরীতে ফিলিস্তিনের সকল জিহাদি সংগঠন গত ২৯ ডিসেম্বর যৌথ সামরিক মহড়া দেয়, যেখানে দেখা যায় ইরানি মিসাইল ও ড্রোন।
সোলেমানি হত্যার এক বছর পূর্তিতে ইরানে বিক্ষোভ মিছিল
সোলেমানি হত্যার এক বছর পূর্তিতে ইরানে বিক্ষোভ মিছিল

তবে আরব দেশগুলোর ইজরায়েলমুখীতার পেছনে ইরান তার কূটনৈতিক ব্যর্থতার দ্বায় এঁড়াতে পারেনা। বিগত বছরগুলোতে নতুন করে ইরান কাউকে বন্ধু বানাতে পারেনি নিজ প্রচেষ্টায়। অপরদিকে ট্রাম্প সকল ব্যর্থতার পরেও শেষ মুহূর্তে আরব দেশগুলোকে ইহুদি বৃত্তে ঢুকানোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু সোলেমানির পর ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যার মাধ্যমে ইরানবিরোধীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
.
.
সোলেমানির মৃত্যুর পর ইরান ঘোষণা দিয়ে এক দফা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির মাত্রা বৃদ্ধি করে, আর ফখরিজাদেহ হত্যার পর পুনরায় আরেক দফায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি বাড়ায়। এর পাশাপাশি অবৈধভাবে এসব হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হওয়ার ফলে বিশ্বে ইরানের নৈতিক অবস্থান আরো দৃঢ় হয়, যার ফলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি নিয়ে জোর প্রতিবাদ করতে পারেনি কেউ। কিন্তু দেশের বাইরে নিজেদের সমরনায়ক এবং খোদ দেশের ভিতরে পরমাণু কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু হত্যা ইরান সরকারের অক্ষমতাই প্রকাশ করে বৈকি। ফলে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগে আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে ইরান নতুন কাওকে হারালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা
.
.
এখন সকলের প্রশ্ন একটাই; যে দেশ নিজেদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং স্থাপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারেনা, তারা কিভাবে শত্রুর সাথে যুদ্ধে বিজয়ী হবে?
সোলেমানির পরও সোলেমানির নীতিকে আঁকড়ে ধরে, ফখরিজাদেহর পর আরো দশ জন ফখরিজাদেহ তৈরি করে ইরান হয়তো নিজেদের যোদ্ধা জাতি হিসেবে পরিচয় দিবে, কিন্তু যতদিন এসব নীতি, ব্যক্তি ও স্থানের নিরাপত্তা ইরান সরকার নিশ্চিত করতে পারবে না ততদিন তারা শত্রু মোকাবেলার যোগ্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি পাবেনা।
.
.
আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথভাবে মনোনিবেশ করতে হলে ইরান সরকারকে সর্বপ্রথম দেশের মানুষের মত প্রকাশের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে নিজেকে জনপ্রিয় করে গড়ে তুলতে হবে। ইরান সর্বশেষ ফখরিজাদেহ হত্যার বিবরণে ইরানেরই কয়েক ডজন বিশ্বাসঘাতকের সম্পৃক্ততা উল্লেখে করে ৪৮ জনকে শনাক্ত করেছে, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং জনগণের অসন্তুষ্টিরই প্রামাণ। এর আগে ২০২০ এর ৩০ জুন নাতাঞ্জ পরমাণুকেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং ২০১৮ সালে ইরানের পরমাণু কেন্দ্র থেকে ৫০০০ পৃষ্টার পরমাণু নথি চুরির ঘটনা অভ্যন্তরীণ সরকারি জনপ্রিয়তা সংকট এবং দূর্বলতারই প্রমাণ বটে।
.
.
সুতরাং ইরানের মধ্যপ্রাচ্য নেতৃত্ব দেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হলে প্রথমে নিজের ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হুমকি-ধমকি শুধুমাত্র মিডিয়ার খোরাক হিসেবেই থেকে যাবে, যা থেকে ইরান কখনো লাভবান হবেনা। অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সোলেমানি হত্যার এক বছরপূর্তীর শপথ হওয়া উচিত, তাহলেই কেবল ইরান-তুরষ্ক-পাকিস্তান মৈত্রি ফলপ্রসূ হবে, যা ইরানকে প্রকৃত আঞ্চলিক নেতা হতে সাহায্য করবে।  

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.