-->

উগ্রবাদের পথে হাঁটছে বিশ্ব

বর্তমান বিশ্বের অনেকগুলো গণতান্ত্রিক দেশেই কট্টরপন্থা জনপ্রিয়তা লাভ করছে এবং এর সমর্থনে সরকারও নির্বাচিত হচ্ছে, যা খুবই আশ্চর্যজনক এবং নির্মম সত্য

বিশ্বে দিন দিন যেভাবে কট্টরপন্থা, উগ্রবাদ বা মৌলবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বিশ্ব থেকে শান্তির নিশানা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের অনেকগুলো গণতান্ত্রিক দেশেই কট্টরপন্থা জনপ্রিয়তা লাভ করছে এবং এর সমর্থনে সরকারও নির্বাচিত হচ্ছে, যা খুবই আশ্চর্যজনক এবং নির্মম সত্য। এবং দুঃখজনকভাবে এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে, যা বিশ্বকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছে দিন দিন।

উগ্রবাদের পথে হাঁটছে বিশ্ব

বিশ্বে দিন দিন যেভাবে কট্টরপন্থা, উগ্রবাদ বা মৌলবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বিশ্ব থেকে শান্তির নিশানা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের অনেকগুলো গণতান্ত্রিক দেশেই কট্টরপন্থা জনপ্রিয়তা লাভ করছে এবং এর সমর্থনে সরকারও নির্বাচিত হচ্ছে, যা খুবই আশ্চর্যজনক এবং নির্মম সত্য। এবং দুঃখজনকভাবে এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে, যা বিশ্বকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছে দিন দিন।


বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আমরা এখন দেখি কট্টরপন্থার সমর্থন করছে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের সমর্থন দিচ্ছে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই "উগ্র জাতীয়তাবাদ"-এ বিশ্বাসি। এই তত্ত্বটি প্রথম দিকে অধিক সমালোচিত হলেও বর্তমানে মানুষের মাঝে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
উগ্রবাদের পথে হাঁটছে বিশ্ব
উগ্রবাদের পথে হাঁটছে বিশ্ব

এই কট্টরপন্থা, উগ্র জাতীয়তাবাদের দিকে মানুষের সমর্থন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল বিশ্বে অন্যায়-অত্যাচার বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিশ্ব মোড়লদের নৈতিকতাহীন আচরণ। যখন একটি দেশে কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে অত্যাচার করা হয়, তখন সেই অত্যাচারিত গোষ্ঠীর মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয় ধীরে ধীরে, যার ফলে আমরা বিভিন্ন উগ্রবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের আবির্ভাব দেখতে পাই।


বিখ্যাত কিংবদন্তি চীনা সমরবিদ সানজু বলেন, যুদ্ধে তোমার শত্রুর যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে, তখন তাকে আর আক্রমণ করতে যেওনা, তাকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দাও। কেননা মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, মৃত্যু আবশ্যক জেনে সে শেষবারের মতো মরণপণ লড়াই করে হিংস্র হয়ে। আর এমতাবস্থায় একজন শত্রু কখনো তোমার বিশ জন সৈন্যকেও হত্যা করতে পারে যা তোমার জন্য বিপদজনক বা ক্ষতির কারণ হয়ে যাবে।


ঠিক তেমনি আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো মিয়ানমারেও দেখতে পাই আরসা কিংবা আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা অত্যাচারিত হতে হতে শেষরক্ষা করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে দেশের বিরুদ্ধে। আবার এইসব উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কার্যক্রম ঠেকাতে কিংবা বিরোধীতা করতেই দেশের জনগণ গণহত্যার মতো ভয়ানক মানবতাবিরোধী কার্যক্রমকে সমর্থন দেয়। এভাবে কোন পক্ষই সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি বা নিরাপত্তার দেখা পায়না, বরং হিংস্রতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আখড়া হয়ে উঠে নিজেদের প্রিয় মাতৃভূমি।
উগ্রবাদের পথে হাঁটছে বিশ্ব
উগ্রবাদের পথে হাঁটছে বিশ্ব

আমরা বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, একটা সময় তাদের পৃথিবীব্যাপী সুনাম ছিল গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য, কিন্তু এখন কি তা আদৌ আছে?
বর্তমান বিজেপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সারমর্মই ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছি ভারতের এনআরসি(NRC) এবং সিএএ(CAA) এর মতো ভয়ানক আইন যা সামগ্রিকভাবে পুরো উপমহাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং বৃহদাকারে অভিবাসন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। করোনাকালীন সময়ে এখন কিছুটা স্তিমিত আছে এসব আইনের বাস্তবায়ন, তবে করোনাভীতি শেষে যখন পুনরায় আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে তখনই আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারব। আমরা দেখেছি এই আইনের যৌক্তিকতা নিয়ে স্বয়ং ভারতেই ব্যাপক বিতর্ক এবং আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দলসহ অনেক রাজ্যই তা বাস্তবায়ন করবেনা বলে জানিয়েছে, আর এভাবেই অনাকাঙ্ক্ষিত সেই উগ্রবাদ এবং বিশৃংঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে হয়তো।


ভারত এসব আইনের মাধ্যমে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় বিশ লক্ষ নাগরিককে বাংলাদেশি পরিচিতি দিয়েছে। এছাড়া কিছুদিন আগে এই করোনা মহামারীর মধ্যেও আসামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসমক্ষে ব্যানার লাগিয়ে একটি সংগঠন উল্লেখ করে, যারা বাংলা ভাষাভাষী তারা ভারতের নাগরিক নয় বরং বাংলাদেশি। সুতরাং এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরো ভয়ানক আকার ধারণ করবে, যা উগ্রবাদ এবং কট্টরপন্থাকে উস্কে দিয়ে ভারত এবং তার প্রতিবেশি রাষ্ট্রের শান্তি বিনষ্ট করবে।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্প সরকার অভিবাসন বিরোধীনীতি গ্রহণ, স্বাস্থ্যনীতি বিরোধী এবং বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর পরেও মার্কিন নাগরিকদের একটি বিশাল অংশ ট্রাম্পের সমর্থনে রয়েছে।


এভাবেই বিশ্বে ধীরে ধীরে কট্টরপন্থা এবং উগ্রনীতির কারণে গণতান্ত্রিক দেশগুলোও চলে যাচ্ছে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের তত্ত্বাবধানে। আর রাষ্ট্র যখন কট্টরপন্থার আশ্রয়ে চলে, তখন সেখানে কখনো পরিপূর্ণ গণতন্ত্র চর্চা হয়না এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অবহেলা-অত্যাচারের শিকার হয়। ফলে জনগণের মাঝে অসন্তুষ এবং ক্ষোভ বিরাজ করে, যা জনগণকে নৈতিকভাবে পদস্খলিত করে।


তাই উগ্রবাদ বা কট্টরপন্থা থেকে বেঁচে থাকতে হলে প্রথমে জনগণের মাঝে সুশিক্ষা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপরাধবিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব হলো, "যত অত্যাচার তত বিদ্রোহ"। শাসক গোষ্ঠী যত অত্যাচার করবে ততই বিদ্রোহীগোষ্ঠী, স্বাধীনতাকামী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দল গড়ে উঠতে থাকবে।


এই উগ্র জাতীয়তাবাদের আরেকটি মারাত্মক পরিণতি হতে পারে দেশে দেশে, বিভিন্ন জাতির মধ্যে যুদ্ধ-সংঘাত। শতাব্দির বিখ্যাত মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্ট সেমুয়েল হান্টিংটনও এর পরিণতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে "সভ্যতার সংকট (Clash of Civilizations)" তত্ত্ব প্রদান করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সভ্যতাসমূহ নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষায় একে অপরের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হবে এবং পরিশেষে বৃহৎ তিনটি সভ্যতা তথা পাশ্চাত্য, চৈনিক এবং মুসলিম সভ্যতা অবশিষ্ট থাকবে এবং তাদের মাঝে সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যাবে।


বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাচ্ছি কট্টরপন্থী বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলো কিভাবে বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে। অত্যাধিক শোষণের ফলে একসময়কার শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও এখন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছে, অবরোধের শিকার হচ্ছে। প্রতিটা রাষ্ট্রই আত্মোন্নয়নের পথে অপর রাষ্ট্রকে পদদলিত করার নীতির দিকে ধাবমান হচ্ছে যা বিশ্ব শান্তিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, নিজে দেশে এবং বিশ্বে শান্তি রক্ষা করতে হলে গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা ও জনগণের মাঝে সমানাধিকার নিশ্চিতকরণের কোন বিকল্প নেই।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.