-->

বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে?

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাঠ তথা মধ্যপ্রাচ্যের উদিয়মান শক্তি ইরান এবং তুরষ্কের প্রতি বাইডেন কী ধরনের ভূমিকা রাখবেন তা এখন অনেকেরই চিন্তার বি

বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নতুন প্রার্থীর বিজয় বিশ্বনেতৃত্বে সৃষ্টি করেছে একাধারে আশার আলো, অস্বস্তি এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। মার্কিন মুল্লুকের নতুন কর্ণধারের আচরণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বিশ্ব মিডিয়াগুলো এখন সরগরম। এর অন্যতম কারণ হল বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সংকট এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন।

বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে?


বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাঠ তথা মধ্যপ্রাচ্যের উদিয়মান শক্তি ইরান এবং তুরষ্কের প্রতি বাইডেন কী ধরনের ভূমিকা রাখবেন তা এখন অনেকেরই চিন্তার বিষয়। এতদিনের সকল জল্পনা-কল্পনার পর সম্প্রতি সিরিয়া বিষয়ক মার্কিন দূত জেমস জেফরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তুর্কি বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী পিকেকে-কে সিরিয়া থেকে সরিয়ে নেবে তুরষ্কের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে। সন্ত্রাসিদের সাথে সম্পৃক্ততার অজুহাত দেখিয়ে গেরিলা গোষ্ঠীটির সমর্থন বন্ধ করার কারণ স্বরূপ তিনি বলেন, এই গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়ার করণে তুরষ্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, যা পুনরোদ্ধার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।


বাইডেনের ক্ষমতায় আসার পরপরই এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিত মার্কিনিদের নতুন তুরষ্কনীতির ইঙ্গিতই বটে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে ধরা যায় সিরিয়ায় তুরষ্কের সহায়তা নিয়ে মার্কিনিদের নতুনভাবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি এবং রাশিয়াকে চাপে ফেলা। আর এই উদ্দেশ্য পাকাপোক্ত করতে মধ্যপ্রাচ্যের অপর শক্তি ইরানকেও শান্ত রাখতে পরমাণু চুক্তি নবায়নের চিন্তা করছেন বাইডেন।


ইতোমধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি বিষয়ক বিশ্লষক ড্যানিয়েল প্লেটকাসহ অনেকেই বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি ইরানঘেঁষা এবং সৌদি বিমুখ হতে পারে বলে মতামত দিয়েছেন। সম্প্রতি দেখা গেছে, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ট বন্ধুরাষ্ট্র হলেও প্রায় চব্বিশ ঘন্টা পর বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়েছে। [রয়টার্স]


তবে ইরানঘেঁষানীতি গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করতে ইজরায়েলের অভিবাসন মন্ত্রী হানেগোভি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, বাইডেনের ইরানঘেঁষানীতি ইরান-ইজরায়েলকে সহিংতার দিকে ঠেলে দেবে।
কিন্তু ইজরায়েলি ফরেন এফেয়ার্স এন্ড ডিফেন্স কমিটির চেয়ারম্যান জোভেভি বলেন, "ওবামার সময় বাইডেনকে দেখেছি, তিনি ইজরায়েলের একজন পরীক্ষিত বন্ধু। যদি পরমাণু চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হয় তাহলে তা আগের থেকে অনেক বেশি কার্যকরী হবে।"
বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে?
বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে?

এর প্রেক্ষিতে ধারণা করা যায়, পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপন নিয়ে বাইডেনের আপত্তি থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েলি শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে মার্কিননীতি অব্যাহত রাখবে তার সরকার, যা সাম্প্রতিক সময়ে আমিরাতসহ অন্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইজরায়েলি চুক্তিতে বাইডেনের সম্মতি প্রদানের মাধ্যমে বোঝা গেছে।


অপরদিকে ইয়েমেনে আগ্রাসন পরিচালনায় সৌদি জোটে মার্কিন সমর্থন হ্রাস করার মতো নতুন কর্মসূচি আসতে পারে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া ইরানের সাথে সম্পর্কে ভারসাম্য আনলে, নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে ইয়েমেনে ইরানি সমর্থনপুষ্ট হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আগ্রাসনে বাইডেনের সহায়তা হ্রাস পাওয়াটাই যুক্তিযুক্ত।


মধ্যপ্রাচ্যে বাইডেনের ইরান এবং তুরষ্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের হেতু হিসেবে উল্লেখ করা যায় রাশিয়াকে চাপ দেয়া এবং সিরিয়ায় নতুন অবস্থান সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নেয়া, যা এখন অনেকটা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। লিবিয়া এবং চলমান আজারবাইন যুদ্ধে মার্কিনিদের দর্শকের ভূমিকা এবং রাশিয়ার সক্রিয়তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধেও মধ্যস্থতাকারী বা অন্য যেকোন ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবেশের সুযোগ দেয়নি রাশিয়া এবং তুরষ্ক কেউ-ই। গতকাল আচমকা রাশিয়া চমৎকার একটি চুক্তি সম্পাদন করে ককেশাসে নিজের কর্তৃত্ব এবং নিরপেক্ষতা আরো মজবুত করে নিলো। এবং এই চুক্তি যাতে লঙ্ঘন না হয় তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া সেনা মোতায়েন করেছে ইতোমধ্যেই, তুরষ্কও করবে শীঘ্রই। এতে উক্ত অঞ্চলে তুর্কি অবস্থান মাঠ পর্যায়ে আরো শক্তিশালী হয়ে গেলো।

বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে?
বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে?


উপর্যুক্ত ঘটনাবলীসহ সিরিয়া, লিবিয়া ও আজারবাইজানে তুরষ্ক-রাশিয়ার কৌশলি ভূমিকার মাধ্যমে নিজেদের সম্পর্ক রক্ষাকরণ থেকে বোঝা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোন নেতা তথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ কেউই চায়না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাল্টানোর সাথে সাথে তড়িঘড়ি করে রাশিয়ার নিজ অঞ্চলে চমৎকারভাবে চুক্তির মাধ্যমে শান্তি এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে টেকসই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এখানে বলাবাহুল্য যে, ট্রাম্পের তুলনায় বাইডেনকে সামাল দেয়া রাশিয়া এবং চীন উভয়ের জন্য়েই যথেষ্ট চেলেঞ্জিং হবে, যার প্রস্তুতি রাশিয়া নিতে শুরু করেছে।


তবে বিশ্ব রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প আমলের ভরাডুবি থেকে পুনরুত্থান ঘটাতে বাইডেন নিতে যাচ্ছেন নতুন কর্মপরিকল্পনা। মধ্যপ্রাচ্যের "ইসলামিক সেন্টিমেন্ট"-কে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার লাগাম টানতে বদ্ধ পরিকর তিনি। গতকাল নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হেরিস ট্রাম্পের কথিত ডিল অব সেঞ্চুরি থেকে বের হয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, তার সরকার কোনভাবেই ট্রাম্পের একপেশে নীতি সমর্থন করবে না, ফিলিস্তিনিদের সাথে আবারো শান্তি আলোচনা শুরু করবে বাইডেন সরকার। বন্ধ করে দেয়া ফিলিস্তিনি ত্রাণ কার্যক্রমও পুনরায় শুরু করবে তার সরকার।


একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে কোনঠাসা করতে বাইডেন একক ভারতের উপরে নির্ভরশীল না হয়ে পাকিস্তানকেও সাথে পেতে তাঁর অর্জিত পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব "হেলাল-ই-পাকিস্তান"-কে কাজে লাগাতে পারেন। ট্রাম্পের পাকিস্তান বিমুখ নীতি থেকে সরে আসার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিও সম্প্রতি শুরু হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করবেন বাইডেন।


নতুন মার্কিন কর্ণধার কতটা ঠান্ডা মাথার দাবাড়ু তা ওবামা আমলে বিশ্বনেতারা দেখেছেন বলেই হয়তো এখনো চীন এবং রাশিয়া তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন শুভেচ্ছাবার্তা পাঠায়নি। ট্রাম্প এবং বাইডেনের কীর্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বাইডেন তুলনামূলক অনেক বেশি যুদ্ধপ্রবণ। ট্রাম্প হুমকি-ধমকি এবং অবরোধে বিশ্বাসি হলেও বাইডেন অনেকটা কাজের উপর বিশ্বাসি বলেই ধারণা করা হয়। সেক্ষেত্রে বলা যায়, প্রথম দিকে বাইডেন নিজের নীতি অনুযায়ী সার্বিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্বে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার পরে প্রয়োজন অনুযায়ী ইরাক-লিবিয়ার মতো অপর রক্তক্ষয়ী সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করবেন না।


তবে আপাতদৃষ্টিতে প্যারিস চুক্তিসহ বিশ্ব সংস্থায় বাইডেনের ফিরে আসার মতো শান্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বে শান্তির পূর্বাভাসই দিচ্ছে। আশাকরছি বাইডেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যোগ্য নেতৃত্বের আসনে নিয়ে আসার মাধ্যমে বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ-সংঘাত হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.