-->

ইরানে ফখরিজাদেহ হত্যার নেপথ্যে

এরপর ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রথম ধাপ হিসেবে একটি মিটিঙের কথা জানা যায়। ১৯৮৭ সালে দুবাই শহরে ইরান একটি মিটিং আয়োজন করে, যেখানে আট জন সদস্যের মধ্যে তি

গত ২৭ নভেম্বর মধ্যপ্রাচ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মূল হোতা মুহসিন ফখরিজাদেহকে আবসার্দ শহরের একটি রাস্তায় সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে হত্যা করা হয়। হামলার ধরণ ছিল সেই আগের মতোই। প্রথমে গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ, অতঃপর মেশিনগানের গুলিবর্ষণ। উল্লেখ্য যে, ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যার এই চোরাগুপ্তা হামলার নীতি ইজরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগে থেকেই অনুসরণ করে আসছে।

ইরানে ফখরিজাদেহ হত্যার নেপথ্যে

আশির দশকে ইসলামি বিপ্লব ঘটিয়ে ইজরায়েলি দোসর রেজা শাহ পাহলভিকে উৎখাতের মাধ্যমে বর্তমান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র সরকার ইরানকে ইজরায়েলের শত্রুর আসনে বসায়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর ধর্মীয় সরকার ঘোষণা করলো, ইসলামে পরমাণু কর্মসূচির কোন বৈধতা নেই, ফলে সব চুল্লি ধ্বংস করা হল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই তথা ১৯৮০ সালে ইরান ইরাকের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। এই যুদ্ধে সাদ্দাম হোসাইন ইরানিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক গ্যাস প্রয়োগ করে এবং এর বিপরীতে তুলনামূলক অপ্রচলিত অস্ত্রগুলো ইরানের বিপদ ডেকে আনে। যুদ্ধের পর প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ক্ষুদ্ধ হয়ে নিজস্ব অস্ত্র তৈরি ও উন্নত প্রযুক্তি সংগ্রহে জোর দেন। তার পরপরই সরকারি এবং ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়া পাল্টে যায়! তারা ভোল পাল্টে বলেন, "আত্মরক্ষার্থে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যাবে।"
.
.
এরপর ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রথম ধাপ হিসেবে একটি মিটিঙের কথা জানা যায়। ১৯৮৭ সালে দুবাই শহরে ইরান একটি মিটিং আয়োজন করে, যেখানে আট জন সদস্যের মধ্যে তিনজন ছিলেন ইরানি, দুইজন পাকিস্তানি এবং তিন জন ইউরোপীয়। ধারণা করা হয়, এর সবাই পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন এবং দুইজন পাকিস্তানির মধ্যে একজন ছিলেন পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক ড• আবদুল কাদির খান।
.
.
পরবর্তীতে ভগ্ন সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্ত্র এবং যন্ত্রাংশ বিক্রির সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ইরান তার পরমাণু স্থাপনা গড়ে তুলে। এই সম্পর্কে ইজরায়েল প্রথম তথ্য পায় ১৯৯৮ সালের ৮ জুন ইরানের স্বপক্ষত্যাগী একজন বিজ্ঞানী ড• ইফতেখার খানের এফবিআইকে দেয়া তথ্যের মাধ্যমে। এর যাচাই বাছাই চলাকালীন সময়ে চার বছর পর ২০০২ সালে ইরানের বিরোধী দলীয় আন্ডারগ্রাউন্ড এক নেতা সিআইএকে একটি লেপটপ দেয়, যা পরমাণু কেন্দ্রের তথ্যে পরিপূর্ণ ছিল। সর্বশেষ ২০০৪ সালে বিশ্ব সমালোচনার মুখে পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানী পরমাণু ফর্মুলা বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জনের কথা স্বীকার করেন একটি টিভি চ্যানেলে।
ইরানে ফখরিজাদেহ হত্যার নেপথ্যে
ইরানে ফখরিজাদেহ হত্যা


এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যৌথভাবে যুদ্ধ এড়িয়ে কৌশলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করতে চোরাগুপ্তা হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, যা এখন পর্যন্ত চলমান। ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে প্রথম হামলা হয় ২০০৬ সালে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের হামলা এবং বিপর্যয় দেখছি আমরা। সর্বশেষ এই বছরের মাঝামাঝি ২ জুলাই ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, যাতে ঐ প্রকল্পের প্রায় বেশিরভাগ স্থাপনাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
.
.
ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত করার পরও যখন তারা পুনরায় দ্রুত আরো কয়েকটি তৈরি করছে, তখন স্থপনায় হামলার পাশাপাশি পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যা শুরু করে ইজরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। এই হত্যাযজ্ঞ সবচেয়ে বেশি ঘটে ২০১০ সালে। এই বছর ২৯ নভেম্বর ড•মজিদ শাহরিয়ারকে গুলি করে হত্যা করে আততায়ীরা। তিনি ছিলেন ইরানের পরমাণু প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। একই বছর ইরানের পরমাণু উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখা ড• ফেরদাওন আব্বাসি এবং বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী ও অন্যতম পরমাণু উপদেষ্টা মামুদ আলী মুহাম্মদিকে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে হত্যা করা হয়।
[তথ্যসূত্র:-ইসরায়েলের গোয়েন্দা জোহার ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মহাপরিচালক মিশাল।]
.
.
এই পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যার কার্যকরীতা আমরা দেখতে পাই ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারী দেয়া মার্কিন বিদায়ী প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে। জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেন, "ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আপাতত আগামী ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঠেকানো গেছে।" এর প্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে ইরানকে চুক্তির আওতায় নিয়ে এসে পরমাণু কর্মসূচিতে শর্তারোপের মাধ্যমে নিয়েন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করে। তবে চুক্তির ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে ইরান পরমাণু কর্মসূচি জারী রেখেছে বলে ইজরায়েল এফবিআইকে ইঙ্গিত দেয়। এর যাচাই বাছাই চলাকালীন ২০১৮ সালে ইজরায়েল এক সাইবার হামলার মাধ্যমে পরমাণু তথ্য হাতিয়ে নিয়ে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ট্রাম্পীকে লাল সংকেত দেয়ার পরপরই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। এরপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রদান করে ইরানের অর্থনীতি ভেঙ্গে দিয়ে পরমাণু কর্মসূচিতে সংকট সৃষ্টিতে তৎপর হয় যুক্তরাষ্ট্র।
.
.
কিন্তু এখন সবকিছু ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। মার্কিন মুল্লুকে আসছে নতুন কর্ণধার, যিনি ইরানের সাথে চুক্তিতে ফেরার ইচ্ছা জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। বাইডেনের এই ইচ্ছার পেছনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হল, ইরানকে নিজেদের মিত্র সাজিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে রাশিয়ার সাথে ইরানকে সংঘাতে লাগিয়ে দেয়া এবং চীনকে চাপ দিতে মনোযোগ এবং শক্তি বৃদ্ধি করা। আপরদিকে ইসলামিক সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতেও ইতোমধ্যে বাইডেন ফিলিস্তিনিদের প্রতি শীথিলতা দেখিয়েছেন এবং ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন বন্ধের পক্ষে কথা বলেছেন।
.
.
তবে বাইডেনের নতুন এই পররাষ্ট্রনীতি ইজরায়েলের জন্য কিছুটা বেখাপ্পা হতে পারে। তারা কোনমতেই চায়না ইরানের সাথে মার্কিনিরা চুক্তিতে আসুক। ইতোমধ্যেই ইজরায়েলের অভিবাসন মন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, "বাইডেনের ইজরায়েলঘেঁষা নীতি ইরান-ইজরায়েলকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিবে।" কিন্তু এরপরেও বাইডেনের কোন পরিবর্তন না আসা এবং বাইডেন সরকারের প্রতি ইরানের লাগাতার চুক্তিতে ফিরে আসার আহবানের ফলে ইজরায়েল ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
.
.
শুক্তবার ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মূল হোতা ফখরিজাদেহকে হত্যার মাধ্যমে ইজরায়েল নিঃসন্দেহে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে। প্রথমত তাদের দীর্ঘদিনের টার্গেটকে হত্যা করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে, দ্বিতীয়ত এর মাধ্যমে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের তিব্র বৈরি প্রতিবেশ সৃষ্টি করে ভবিষ্যত চুক্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফখরিজাদেহ যে ইজরায়েলের টার্গেটে ছিল তা ২০১৮ সালের নেতানিয়াহুর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ উলমার্টের বক্তব্যে অনেকটাই স্পষ্ট সবার কাছে।
.
.
তবে ফখরিজাদেহর মৃত্যু নিঃসন্দেহে সাধারণ কোন ঘটনা নয় এবং এর প্রতিক্রিয়া থাকবেই। যেমন এই বছরের শুরুর দিকে ইরানি কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাশেম সোলাইমানি হত্যার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনিদের অনেক কিছু হারাতে হয়েছে। ইরান এর ফলস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছিল। এরপর থেকেই শুরু হয় ইরাকে মার্কিন বাহিনীর উপর হামলা এবং দূতাবাসের মতো স্পর্শকাতর স্থানে রকেট লঞ্চার নিক্ষেপ। লাগাতার এসব হামলা আজ মার্কিন সেনাবিহিনীকে অতিষ্ট করে তুলেছে এবং তারা সেখান থেকে সেনা ফিরিয়ে আনা শুরু করেছে। তদুপরী ইরাকের পার্লামেন্টে ইরান নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন বাহিনী হঠানোর আইন পাশ করিয়ে নিয়েছে।  অন্যদিকে সিরিয়ায়ও মার্কিন বাহিনীর পরিসর ছোট হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। সোলেমানি হত্যার পর এখন পর্যন্ত সিরিয়ায় মার্কিন বহরে এগার বার হামলা করেছে ইরানি সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলো।
.
.
তবে সোলেমানির মতো ফরেখজাদিহর ক্ষেত্রে অতটা কার্যকরী ভূমিকা এখন তাৎক্ষণিকভাবে নিতে পারবেনা ইরান। কারণ তারা জানে এই হত্যার মাধ্যমে তাদেরকে যুদ্ধে টেনে নামাতে চাইছে ইজরায়েল, তাই ইরানি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "এর প্রতিশোধ নেয়া হবে, তবে তা এখনই নয়।" আর যুদ্ধের উস্কানি কিংবা নিরাপত্তার স্বার্থে হামলার কিছুদিন আগেই মধ্যপ্রাচ্যে আচমকা পরমাণু বোমা বহনে সক্ষম মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এবং হত্যাকান্ডের দিনই তথা ২৭ নভেম্বর পরমাণু চালিত বিমানবাহী মার্কিন রণতরী ইউএস নিমিত্জ মোতায়েন করা হয়েছে পারস্য উপসাগরে। এছাড়াও ট্রাম্প সরকার ইরাক এবং আফগানিস্তান থেকে ১৫ জানুয়ারীর মধ্যেই সব সেনা ফিরিয়ে আনবেন, যা তাদের সেনাশক্তি একত্রিকরণেরই অংশ বলা যায়।
.
.
তাই ধারণা করা যায়, সম্প্রতি পম্পেও-নেতানিয়াহু-বিন সালমানের মিটিঙে তৈরিকৃত ফখরেজাদিহ হত্যার ফাঁদ ইরান বুঝতে পারলেও তাদের জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে আরো অনেক কিছুই। বর্তমানে ইরান বিরোধীদের সর্বাত্মক তৎপরতা শুরুর অন্যতম কারণ হল, এই মাসের (নভেম্বর) শুরুতে দেয়া আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার বক্তব্য। তারা বলেছে, "ইরান বর্তমানে চুক্তিতে উল্লেখিত পরিমাণের চেয়ে বার গুণ বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে।" এর পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু বোমা তৈরির অভিযোগ আরো জোড়ালোভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে পেশ করতে থাকে সৌদি আরব। সৌদিরও হঠাৎ এই সরব হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো, ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের ক্ষমতাবৃদ্ধি এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রে সুসজ্জিত হওয়া। তদুপরী মার্কিন নয়া সরকার এবং বৃটেনের পার্লামেন্টের ইয়েমেন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান ।
.
.
সুতরাং পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইরানকে বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা আবলম্বনের পাশাপাশি ছোটখাট যেকোন ভুল পদক্ষেপের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। অন্যথায় তাদের উঠতি অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের পরমাণু শক্তিধর হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.