-->

মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বে কে আসছে?

বিশ্বরাজনীতির অনেকটাই পরিচালিত হয় মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে। এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো সর্বদা সচেষ্ট ছিল এবং থাকবে। তবে দিন দিন আমরা দেখতে পাচ্ছি এখানকার স্থানীয় দেশগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠায় পশ্চিমা পরোক্ষ কর্তৃত্ব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। আর শক্তিশালী হওয়ার দৌড়ে যে কয়েকটি দেশ আছে তন্মধ্যে ইরান এবং তুরষ্ক প্রধান।

বিশ্বরাজনীতির অনেকটাই পরিচালিত হয় মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে। এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো সর্বদা সচেষ্ট ছিল এবং থাকবে। তবে দিন দিন আমরা দেখতে পাচ্ছি এখানকার স্থানীয় দেশগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠায় পশ্চিমা পরোক্ষ কর্তৃত্ব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। আর শক্তিশালী হওয়ার দৌড়ে যে কয়েকটি দেশ আছে তন্মধ্যে ইরান এবং তুরষ্ক প্রধান।

মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বে কে আসছে?

সুতরাং প্রশ্ন এসেই যায়, ভবিষ্যৎ নেতা কে হবে? কারণ কথায় আছে, "এক বনে দুই রাজা থাকতে পারে না"। তাই আসুন দেখে নিই কার সম্ভাবনা কতটুকু••• ইরান এমন একটি দেশ, যার অতীতে রয়েছে মাটি কামড়ে বারংবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরমাণু শক্তি অর্জনে কার্যক্রম পরিচালনার ইতিহাস। আমরা সম্প্রতি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বে তোলপাড় দেখলেও এই কর্মসূচি ইরান শুরু করেছে ১৯৮৭ সাল থেকে!

ইরানের স্বল্প পাল্লার পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশই এখন একমত। যেমন গত জুলাই মাসে ইসরায়েলি এক সমরবিদ বলেছিলেন, "ইরানের পরমাণু কার্যক্রম এখন আর ধরে রাখার মতো নেই, বরং ইসরায়েলকে প্রতিরোধের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।" এছাড়াও ইরান গত মাসে মাটির নিচের অস্ত্রের শহর থেকে ভূমধ্যসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে যে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে, তা তাদের অনেক কিছুই প্রকাশ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বে কে আসছে?
মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বে কে আসছে?

অপরদিকে আছে উদীয়মান শক্তি তুরষ্ক। সিরিয়ার সাথে স্বল্প কিছুদিনের যুদ্ধে সম্প্রতি তুরষ্ক যে ড্রোনবাজি দেখিয়েছে বিশ্বকে, তা বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সমরবিদদেরকেও প্রভাবিত করেছে। এর পরপরই, রাশিয়াসহ অনেক দেশের সমরবিদরা ড্রোনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ধরণ পাল্টে যাবে বলে নিশ্চিত হয়। এছাড়া সম্প্রতি লিবিয়া, আজারবাইজান, সিরিয়া এবং ইরাকে তুরষ্কের যেভাবে সক্রিয় ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটছে, তা এরদোগানের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অর্জনের সূচনা বলে ধরা যায়।
এছাড়া তুরষ্ক প্রজাতন্ত্রের শতবর্ষপূর্তী অনুষ্ঠানে এরদোগান সরাসরি বলেছিলেন, "তুরষ্ক ২০২৩ সালের লক্ষ্যে পৌঁছার পর পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যতকে নতুন অবয়ব দেবে। তুরষ্ক এখন নতুন বিজয়ের ও সাফল্যের দোরগোড়ায়।"
তবে সম্প্রতি তুরষ্কের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা তুরষ্ককে নতুনভাবে পর্যালোচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। বলাবাহুল্য যে, এই গ্যাসক্ষেত্র তুরষ্ককে অদূর ভবিষ্যতে পরাশক্তিরূপে গড়ে তুলবে। এর অন্যতম কারণ হলো তুরষ্ক এতদিন জ্বালানির জন্য সম্পূর্ণভাবে বিদেশের প্রতি নির্ভরশীল ছিল এবং অর্থনীতির বড় অংশ এতে ব্যায় করতে বাধ্য ছিল। এখন সবাই সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, এই বিপুল অর্থ অস্ত্র গবেষণা এবং পরমাণু প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ করবে তুরষ্ক। ইতোমধ্যেই তুরষ্কের অস্ত্রের ক্রেতাদেশ আছে অনেকগুলো, তা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।
লুজান চুক্তি অনুসারে তুরষ্ক বাইরে এবং নিজ দেশে, কোথাও কোন ধরনের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারবে না, নিজ দেশের কোন জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে না এবং এশিয়া ইউরোপকে সংযুক্তকারী চ্যানেল বসফরাস প্রণালীতে কোন ধরনের প্রভাব খাটাতে পারবে না। কিন্তু চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই দুটোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে তারা। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ইতোমধ্যেই পুরোদমে শুরু করেছে তুরষ্ক এবং বসফরাসে সরাসরি কিছু না করলেও সিরিয়ার হামলায় রাশিয়া সরাসরি কিছু করলে বসফরাসে তাদেরকে যে কুপোকাত করা হবে, তুরষ্ক তার পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছিল।
তবে আঞ্চলিকভাবে প্রভাব বিস্তারে ইরানের তুলনায় পিছিয়ে আছে তুরষ্ক। ইরানের বিশাল সক্রিয় মিলিশিয়া বাহিনী আছে সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লেবাননসহ অনেকগুলো রাষ্ট্রে, যেখানে লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা বিছিয়ে রেখেছে ইরান। সেই তুলনায় তুরষ্ক প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে মাত্র।

২০২৩ এর পরে তুরষ্ক যে নতুনরূপে উদ্ভূত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এক্ষেত্রে তারা সরাসরি ভূখন্ড বৃদ্ধি না করলেও যে নিশ্ছিদ্র প্রভাব বৃদ্ধি করবে তার প্রমাণ হলো তাদের বর্তমান কর্মসূচি। লিবিয়ায় জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে সমর্থন, আজারবাইজানে সরাসরি সামরিক সমর্থন, সিরিয়ার রাক্বা এবং আফরিন শহরে সেনা প্রভাব প্রতিষ্ঠা, উত্তর ইরাকে গত এক মাসে কয়েকবার ভয়ানক বিমান হামলা, এগুলো ২০২৩ সাল পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতি বলে ধরে নেয়া যায়।
সর্বশেষ প্রমাণ হলো ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনীর বক্তব্য। ইসরায়েল-আমিরাত চুক্তির জন্যে যে মানুষটি সর্বাধিক প্রশংসিত হচ্ছেন, তিনি হলেন মোসাদ প্রধান ইউসি কোহেন। তিনি বছরের পর বছর উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধানদের সাথে বিভিন্নভাবে বৈঠক করে নিজ দেশের পক্ষে সমর্থন আনার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি, আমিরাত, মিশর ও পার্শবর্তী দেশগুলোকে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন।
তবে ২০১৮ সালে মোসাদ কর্তৃক ইরানের পরমাণুকেন্দ্র থেকে ৫৫,০০০ ফাইলের গোপন পরমাণু নথি হাতিয়ে নেয়ার পর বিশ্বে নতুন অনেক কিছুই ঘটে। এই নথির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির আড়ালে ইরানের চলমান পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়।

মোসাদের হাতে নথি পৌঁছার পর তথ্য বিশ্লেষণ শেষে ২০১৯ সালে মোসাদ প্রধান ঘোষণা দেন, "ইরানের পরমাণু কার্যক্রম অকার্যকর। বরং ইরানের চেয়েও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ বড় হুমকি হলো তুরষ্ক।" তখন থেকেই তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে নতুনভাবে তুরষ্কের বিরুদ্ধে বোঝাতে থাকেন। এছাড়া ২০১৯ সালের জানুয়ারীতে সর্বপ্রথম ইসরায়েল তাদের শত্রুর নতুন তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তুরষ্ককে অন্তর্ভুক্ত করে, কিন্তু কত তম স্থানে আছে, ইরানের আগে নাকি পরে তা জানায়নি। [রয়টার্স]
তবে তুরষ্কের বিরুদ্ধে ইরানের মতো একই কায়দা অবলম্বন ইসরায়েলকে যথেষ্ট হতাশ করবে। এর পেছনের অনেকগুলো কারণের মধ্য অন্যতম দুটি হলো: প্রথমত শিয়া-সুন্নি মতভেদ উস্কে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যে আরব জোট তৈরি করতে পেরেছে ইসরায়েল, তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। দ্বিতীয়ত, ইরানে ইসরায়েল যেভাবে চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে শত শত কোটি টাকার পরমাণু সেন্ট্রিফিউজ উড়িয়ে দিয়েছে বিভিন্ন সময়, তা ন্যাটো সদস্য তুরষ্কের বিরুদ্ধে সম্ভব হবে না।
উপর্যুক্ত বাঁধাগুলো ছাড়াও ইসারায়েলের সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, ২০২৩ এর পর তুরষ্কের একসাথে তিনটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা। তাছাড়া একমাত্র পরমাণু শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে তুরষ্কের সাম্প্রতিক গলায় গলায় ভাব মোসাদকে ভাল কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে না। উল্লেখ্য যে, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানে পরমাণু বোমার থিউরি দেয়ার জন্য সর্বাধিক সন্দেহভাজন দেশ হলো পাকিস্তান। ২০০৪ সালে পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক আবদুল কাদির খান টিভির স্বাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, পরমাণু ফর্মুলা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা তিনি আয় করেছেন
এতসব বিষয় অনেক আগে থেকে চিন্তা করেই হয়তো মোসাদ তুরষ্কের বিরুদ্ধে দুই বছর আগে থেকে কাজ শুরু করেছে।
অপেক্ষা রইলো রুহানি ইরানকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এবং ২০২৩ এর পর তুরষ্ক কেমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তা দেখার। সামনের বছরগুলো দুই দেশের জন্যেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হবে। ইরানও চীন, ভেনিজুয়েলার সাথে যুগান্তকারী চুক্তির কারণে আগের সেই অবস্থাতে থাকবে না, আর অক্টোবরে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও উঠে যাচ্ছে তাদের। প্রতিযোগিতা হবে সমানে সমানে•••

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.