-->

আফগান-তালেবান শান্তিচুক্তি কি আদৌ শান্তি বয়ে আনবে?

২০০১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সময়ে অবস্থানকালীন প্রতিজন মার্কিন সেনার পেছনে খরচ হয়েছে বছরে দশ লক্ষ ডলার। এবং সৈন্য নিহত হয়েছে ২,৩০০ জন, আহত হয়েছে ২০,০০০ এর..

সম্প্রতি ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া আফগান-তালেবান সংঘর্ষ এবং মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম  যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাতারের রাজধানী দোহায় ঐতিহাসিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনাকে ঘিরে যেমন তৈরি হয়েছে শান্তির আকাঙ্ক্ষা, তেমনি তৈরি হয়েছে ভীতিও।

আফগান-তালেবান শান্তিচুক্তি কি আদৌ শান্তি বয়ে আনবে?  

আফগান সরকার ও তালেবান, উভয় পক্ষের রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যমাত্রা যা আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে দুই পক্ষই সচেষ্ট। তালেবানের অন্যতম দাবি বিদেশি হস্তক্ষেপ বিহীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও ইসলামি শরিয়া ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা। অপরদিকে আফগান সরকারের দাবি নিরাপদ দেশ গঠন এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাসহ সকলের অধিকার অক্ষুন্য রেখে পারস্পরিক অংশিদারীত্ব নিশ্চিতকরণ। ইতোমধ্যেই আল-জাজিরার সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালেবান-আফগান আলোচনায় আফগান নারীরা নিজেদের স্বাধীনতা এবং অধিকার বিসর্জন দেয়ার আশঙ্কা করছেন।


উল্লেখ্য যে, এই চুক্তির প্রাথমিক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল এই বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান আলোচনার মাধ্যমে। এতে তালেবানের প্রধান শর্ত ছিল আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এই শর্তে রাজি হয়ে ধাপে ধাপে কয়েক বছরের মধ্যে সব সেনা সরিয়ে নেয়ার শর্তেই যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শুরু করেছিল। পরবর্তীতে বর্তমানে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন আফগান সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে ৫,০০০ বন্দির মুক্তি দাবি করে সংগঠনটি। দীর্ঘদিনের দর কষাকষির পর, সর্বশেষ গত মাসে কিছু ভয়ানক হামলার আসামিকেও মুক্তি দিয়ে যাবতীয় শর্ত পূরণের মাধ্যমে আফগান সরকার চলমান আলোচনার পথ উন্মুক্ত করে, যার ফলস্বরূপ দুই পক্ষ এখন কাতারে সামনা সামনি বসেছে। বলা বাহূল্য যে, তালেবান আগে কখনো ক্ষমতাসীন সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, বরং মার্কিন মদদপুষ্ট পুতুল সরকার বলে আখ্যা দিয়ে সরকার প্রদত্ত সব ধরনের আলোচনা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।

আফগান-তালেবান শান্তিচুক্তি
আফগান-তালেবান শান্তিচুক্তি 

এই বছরের শুরুর দিকে সকল সেনা সরিয়ে নেয়ার শর্তে তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়, যার অধিকাংশ হয় খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই। দীর্ঘ ১৯ বছর যুদ্ধ করে পরিশেষে শর্ত মেনে নিয়ে নিজেদের আখ্যায়িত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে এক টেবিলে আলোচনায় বসাটা মার্কিনিরা নিজেদের পরাজয় বলেই বিশ্বাস করেছে। এরপর জনসাধারণে প্রশ্ন উঠে, যুক্তরাষ্ট্র তাহলে ১৯ বছর যুদ্ধ করেছে কিসের আশায়? কিসের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে এই দীর্ঘ সময়ব্যাপী? কী পেয়েছে এই যুদ্ধে?



ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ মতে, ২০০১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সময়ে অবস্থানকালীন প্রতিজন মার্কিন সেনার পেছনে খরচ হয়েছে বছরে দশ লক্ষ ডলার। এবং সৈন্য নিহত হয়েছে ২,৩০০ জন, আহত হয়েছে ২০,০০০ এর অধিক।

তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যখন নিউ ইয়র্ক টাইমসে তালবান নেতা সিরাজুদ্দীন হক্কানির লেখা ছাপানো হয়। একসময় মার্কিনিরা যে নেতার মাথার দাম নির্ধারণ করেছিল ৫০ লক্ষ ডলার!
প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র, পরবর্তীতে আফগান সরকারের বিভিন্ন শর্ত পূরণের মাধ্যমে আলোচনা শুরুকে বিশ্ব শান্তি প্রক্রিয়া মনে করলেও তালেবান এটিকে দেখছে তাদের বিজয় হিসেবে। লেনা-দেনার হিসাবে বসলে দেখা যাবে ঠিকই এক তরফাভাবে তালেবানের অনেক শর্তই পূরণ করতে হয়েছে দুই পক্ষকে। আর যেকোন বিজয়ী শক্তি বিজয়কে টেকসই করতে সর্বদাই শক্তি বাড়াতে বদ্ধ পরিকর থাকে। তালেবানও একই পথে হাঁটবে বৈকি। সাম্প্রতিক সময়ের আফগানিস্তানের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে।


আমরা দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈঠকের এক মাসের মাথায় সরকারি কার্যালয়ে আত্মঘাতি গাড়ি বোমা হামলার মাধ্যমে ভয়ানক এক ঘটনার জন্ম দেয় তালেবান, যাতে ৭০ জনের অধিক সরকারী কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনী সীমিত কয়েকটি ছোট অভাযান পরিচালনা করে জনগণকে ক্ষ্যান্ত করে। এরপর ছোট ছোট অনেকগুলো হামলা হয়েছে সেনা চৌকিসহ বিভিন্ন সরকারী স্থাপনায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বেগ জানিয়েছিল। এমনকি তালেবান শর্তাধীন ৫,০০০ বন্দি মুক্তির সময়েও কয়েকটি হামলা হয়েছে, যার কোন কারণ খুঁজে পায়না সরকার।


সর্বশেষ সবকিছুর উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়, গত ১২ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত কাতারের দোহায় তালেবান-আফগান প্রতিনিধিরা মাইক পম্পেওর মধ্যস্থতায় আলোচনারত অবস্থায় আফগানিস্তানে শুরু হওয়া সেনাবাহিনী-তালেবান ভয়ানক সংঘর্ষের মাধ্যমে। ঘটনার কারণ হিসেবে জানা যায়, পুরনো নিয়মেই তালেবান সদস্যরা সেনা চৌকিতে হামলা চালায় এবং সেনারা প্রতিশোধ নিতে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে পাল্টা হামলা শুরু করে। উক্ত সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত উভয়পক্ষের নিহত শতাধিক।


এতদিন বিভিন্ন স্থানের হামলাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঝটনা বলে বিবচেনা করে আফগান সরকার নিজেকে শান্ত রাখলেও বর্তমান ঘটনাও কি তাদের সেই শান্ত্বনা দিতে পারবে? বিশেষ করে যখন উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা ঐতিহাসিক আলোচনায় কাতারে সামনা সামনি উপবিষ্ট। প্রথম দিনে অর্ধশতাধিক নিহতের পর সর্বশেষ গত শনিবার সরকারী বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে ৪০ জন তালেবান হত্যার কথা জানিয়েছে।


আলোচনা চলাকালীন সময়ে এমন সংঘর্ষ উভয় পক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বৈকি। তবে এই ঘটনা কিসের ইঙ্গিত তা খতিয়ে দেখা দরকার আমাদের। ভালভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, আলোচনা প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে তালেবান গোষ্ঠী দেশব্যাপী আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। একদিকে সরকার আলোচনা প্রক্রিয়া চালাচ্ছে তাদের প্রতিনিধিদের সাথে, অন্যদিকে নিয়মিত হামলা অব্যাহত রাখছে তারা।


বিশ্লেষকদের মতে, সেনা প্রত্যাহার ছিল আলোচনা শুরুর শর্ত, শেষ বা মীমাংসার কোন অংশ নয়। আর এর আওতায় যদি দেশটি থেকে মার্কিন সেনারা বিদায় নেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ভয়ানক হতে পারে। কারণ আলোচনাকালীন সময়েই গোষ্ঠীটি যে ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে, পরবর্তীতে পিরিস্থিতি কেমন হতে পারে তা ধারণা করাই যায়। উল্লেখ্য যে, তাদের প্রধান এবং প্রথম শর্ত হলো দেশের অভ্যন্তরীণ সব বহিরাগত সেনা প্রত্যাহার এবং যাবতীয় বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। ফলে তাদের পরিকল্পনা কী হতে পারে তা বর্তমানের আচরণ দিয়ে বিবেচনা করলে ভাল কিছুর আভাস দেয়না।


মূলত বর্তমানে দেশটিতে সত্যিকারের শান্তি আনতে হলে এবং আলোচনার সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে সীমান্তবর্তী দেশগুলোকে নিয়েই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। ভৌগলিক এবং রাজনৈতিকভাবে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, এছাড়াও আছে পার্শ্ববর্তী অপর দেশ ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে পাকিস্তানের সহায়তা কামনা করলেও পরবর্তীতে ভারত, ইরান এবং পাকিস্তান কাউকে না মাতিয়েই এককভাবে মোড়ল সেজে আলোচনা অনুষ্ঠান করে এবং বর্তমান অবস্থায় পৌঁছায়।


ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুরুর দিকেই বলেছিলেন, আফগানিস্তানে শান্তি আনতে চাইলে ইরানকে বাদ দিয়ে কোন আলোচনা ফলপ্রসূ হবেনা। আদতেও ভূ-রাজনৈতিক নিয়মানুসারে উক্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পার্শ্ববর্তী শক্তিগুলোর অংশগ্রহণমূল টেকসই চুক্তির কোন বিকল্প নেই।


তবে ধারণা করা যায়, এসব তত্ত্ব যুক্তরাষ্ট্র ভাল করে জেনেও ভিন্ন উদ্দেশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চায়না দীর্ঘ ১৯ বছরে যেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তারা সফল হয়নি, সেই রাষ্ট্রটি অভ্যন্তরীণভাবে শান্ত হয়ে যুদ্ধাবস্থা কাটিয়ে উঠুক এবং এমন কোন স্থান হোক, যেখানে পার্শ্ববর্তী ক্ষমতা বিস্তারকারী শক্তি ইরান অথবা পাকিস্তান সহজেই আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। 


এর অন্যতম প্রমাণ হল, আলোচনা কালীন সময়েই গত ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো চারটি সুপার টেকনো মডেলের যুদ্ধ বিমান আফগান সরকারের নিকট হস্তান্তর করেছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আর ছয়টি দেবে বলে নিশ্চিত করেছে, যা হতে পারে উভয়পক্ষের মধ্যকার সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্রও জানে অদূর ভবিষ্যতে এখানে পুনরায় গৃহযুদ্ধ শুরু হবে, আর তাতে গণী সরকারের স্থায়িত্ব দীর্ঘ করতে যুদ্ধ সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের ন্যায় আফগানিস্তানেও দীর্ঘ সময়ের জন্য অশান্তি ও দুঃখ-দুর্দশার নির্মম ইতিহাস রচিত হবে। আর এর থেকে রেহাই পাওয়ায একমাত্র উপায় হলো, সকল গোষ্ঠীকে নিজেদের অন্ধকার ভবিষ্যতকে উজ্জল করতে দেশের উন্নতিকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের স্বার্থে সংঘাত নিরসণে দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.