-->

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একটি হলো মার্কিন মদদপুষ্ট তাদের সমর্থকগোষ্ঠী, অপরটি মার্কিন বিরোধী। এই দ্বন্দ্বের অন্যতম আরেকটি শাখা হলো চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ, যা এখন সামরিক পর্যায়ে গড়াতে যাচ্ছে দক্ষীণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে। আর এই দক্ষিণ চীন সাগরের আধিপত্যের সাথে জড়িয়ে আছে ভারতসহ অনেকগুলো রাষ্ট্রের ভাগ্য।

বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একটি হলো মার্কিন মদদপুষ্ট তাদের সমর্থকগোষ্ঠী, অপরটি মার্কিন বিরোধী। এই দ্বন্দ্বের অন্যতম আরেকটি শাখা হলো চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ, যা এখন সামরিক পর্যায়ে গড়াতে যাচ্ছে দক্ষীণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে। আর এই দক্ষিণ চীন সাগরের আধিপত্যের সাথে জড়িয়ে আছে ভারতসহ অনেকগুলো রাষ্ট্রের ভাগ্য।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ


চীন দক্ষীণ এশীয় অঞ্চলে প্রতিযোগী শক্তিগুলোর উপর প্রভাব বিস্তারের সূচনা করতে চায় ভারতকে দিয়ে, যার ফল হলো বিদ্যমান চীন-ভারত যুদ্ধ উত্তেজনা। কথায় আছে, "পৃথিবীর জলভাগের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, পৃথিবীর শাসনও তার হাতে থাকবে"। ভারতীয় গোয়েন্দা রিপোর্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন মূলত লাদাখকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আইওয়াশের আড়ালে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দ্রুত স্থাপনা তৈরি করছে এবং সাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। চীনের এশীয় অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে মার্কিনিরাও তৈরি করেছে চীন বিরোধী আঞ্চলিক জোট, যেখানে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া অন্যতম।
তবে এখন সব দেশই বুঝে, যুদ্ধ করে স্থায়ী কোন স্বার্থ হাসিল করা যায়না। এখন চলছে নব্য উপনিবেশবাদের যুগ, যেখানে সেনাশক্তিছাড়াই একটি দেশকে অদৃশ্য শক্তি তথা অর্থনীতির মাধ্যমে সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই চীন-ভারত উত্তেজনায় দুই দেশের যতটুকু তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তার দ্বিগুণ তৎপরতা অর্থনৈতিক খাতে অব্যাহত রেখেছে দুই দেশই। এক্ষেত্রে ভারত চীনের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে।
চীন যখন আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির জন্য আট-ঘাট বেঁধে নেমেছিল, তখনই তারা ইরানের সাথে যুগান্তকারী চুক্তি, পাকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক করিডোর ও সামরিক বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে পুরোদমে কাজ আরম্ভ এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও সামরিক সহায়তা প্রকল্প নিশ্চিত করেছিল। অথচ সেই তুলনায় দীর্ঘ কয়েক মাস পর নয়া দিল্লি ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে কাজ শুরু করেছে সম্প্রতি, ভবিষ্যতে আফগানিস্তানেও কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করতে পারে তারা। এতদিন ভারত চীনের তৈরি ত্রিমুখী সীমান্ত চাপ সামলাতে ব্যস্ত ছিলো এবং বাংলাদেশের প্রতি অপেশাদার আচরণের মাধ্যমে অতিমাত্রায় আশাবাদী ছিল।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
সাধারণতই দক্ষীণ এশিয়ার দেশ ও বিশ্বের সপ্তম দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন সবার কাছেই চাষযোগ্য উর্বর ভূমির ন্যায়। তাই বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে সর্বাধিক তাড়া এখন চীন এবং ভারতের। রীতিমত প্রতিযোগীতায় থাকা দুই দেশকেই এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারসাম্য অবস্থায় রেখে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই ভরসাম্য কতদিন থাকবে? ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতি কী?
পদ্মাসেতু, সিলেট ওসমানী বিমান বন্দর, টেকনাফে অত্যাধুনিক সাবমেরিন টার্মিনালের পর সর্বশেষ তিস্তা অর্থনৈতিক মেগাপ্রকল্পের কাজ চীনের দিকে যাওয়ার পর অনেকটাই নড়েচড়ে বসেছে দিল্লি। প্রথমে বিভিন্নভাবে মিডিয়ায় কটুক্তি এবং ব্যাঙ্গাত্মক খবর ছাপানোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে কাছে টানার চেষ্টা করেছিল ভারত। খবরগুলো ভারতীয় মিডিয়া ছাপলেও তাদের বিরুদ্ধে মোদি সরকারের টুঁ শব্দটি দেখা যায়নি, যা সরকারী সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ বৈকি। এরপর চীন-ভারত উত্তেজনাকালীন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সীমান্তে একের পর এক বিএসেফের পাখির মতো বাংলাদেশী হত্যা, করোনাকালীন সময়ে একতরফাভাবে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বন্ধ করে দেয়া সম্প্রতি বাংলাদেশের জন্য নির্ভরযোগ্য কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেনি।
এছাড়াও চীন-ভারত উত্তেজনা পূর্ববর্তী সময়ে এনারসির মাধ্যমে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় বিশ লক্ষ ভারতীয়কে বাংলাদেশী পরিচয় দেয়া, উক্ত পরিস্থিতিতে হঠাৎ বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের খাতিরে নিরব ছিল। এরপর হঠাৎ শুরু হয় বিএসেএফ কর্তৃক সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাগল পুশ করা। ব্যাপারটি সর্বপ্রথম গ্রামবাসী কর্তৃক ফেইসবুকে আসার পর টিভি মিডিয়া এবং প্রেস মিডিয়া তদন্ত করে এটির সত্যতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে, পরবর্তীতে বিজিবি বিসেএফের সাথে এ নিয়ে পতাকা বৈঠক করে।
তাছাড়া চীন-ভারত পরিস্থিতি প্রশমিত হওয়ার পর এনারসি এবং সিএএ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে, শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং পুরো দক্ষীণ এশীয় অঞ্চলে যে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি গবেষকগণ যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত ছিলো।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্য
উপর্যুক্ত ঘটনাবলীর ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ভারত-নির্ভরশীলতা কমিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারকে বেগবান করেছে বলে ধারণা করা যায়। এর সর্বশেষ পদক্ষেপ হলো ভারতের চীর শত্রু পাকিস্তানে বাংলাদেশের বিশাল দূতাবাস স্থাপনের কার্যক্রম। কূটনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে, এর অবিস্মরণীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চমক হিসেবে পাকিস্তান যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির দিক থেকে চিন্তা করলে, পাকিস্তানে দূতাবাস স্থাপনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার আরো অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে। কারণ বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সাধারণত পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট বলে পরিচিত। চীনের পর পাকিস্তানও বর্তমান সরকারের সাথে জোড়ালো সম্পর্ক স্থাপনে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে সম্প্রতি। আর এটি বাস্তবায়িত হলে বিএনপির আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সমর্থন শুন্যের কোটায় নেমে আসবে যা বর্তমান সরকারের ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করবে।
এছাড়া তিস্তার পানি নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ ভোগান্তি ও ভারত কর্তৃক বারংবার অবহেলিত হওয়ার পর সরকার চীনের সহায়তায় তিস্তা নিয়ে মেগা প্রকল্প ঘোষণা করেছে, যা দ্রুততর সময়ে বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট চীন। এই প্রকল্পকে ভারতীয় মিডিয়া, বাংলাদেশের ভিতর থেকে চীন কর্তৃক ভারতের 'চিকেন’স নেক' আয়ত্তে আনার প্রচেষ্টা বলে অবিহিত করেছে।
আলোচ্য ঘটনাবলী থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো এক তরফাভাবে ভারতকে সবকিছু বিলিয়ে দিতে রাজি নয়। এবং ভবিষ্যতে উগ্র হিন্দুবাদী বিজেপি সরকারের এনারসি ও সিএএ বাস্তবায়নকালে বাংলাদেশ যাতে শক্ত অবস্থান নিতে পারে, তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
আর বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষমতায় থেকে ভারতের জন্য অসন্তুষজনক যেকোন কাজ করতে সরকারকে হতে হবে যথেষ্ট মজবুত ভিতের এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট, যা তৈরি করতে বর্তমান সরকার পাকিস্তানের সাথে লাভজনক সম্পর্ক তৈরির মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তাছাড়া চীন, পাকিস্তান ও জাপানের সাথে ফলপ্রসু সম্পর্ক সৃষ্টি বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠিও বটে। একটি অর্থনৈতিকভাবে উঠতি দেশের অগ্রযাত্রা জারী রাখার জন্য এমন ভূমিকাই প্রয়োজন, অন্যথায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্য পূরণের সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
তবে এতকিছুর পরেও ভারত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধু হিসেবে বর্তমান সরকার সর্বদা তাদের প্রতি বন্ধুপ্রতীম। ভারত উগ্রবাদী নীতি বর্জন করে সঠিক কূটনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক সুবিধা নিশ্চিত করলে যেকোন সময় দুই দেশের সম্পর্ক পূর্বের তুলনায় ভাল অবস্থানে যেতে পারে, যা উভয়ের জন্য কল্যাণকর হবে।

তথ্যসুত্রঃ https://www.facebook.com/DefsecaBD/posts/194454692114042

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.