-->

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইরানের রহস্যময়ী ঘটনাসমূহ কী ইঙ্গিত করছে? | যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাইবার যুদ্ধ কি শুরু?

বিশ্বে পরমাণু শক্তির অধকারী হওয়ার দৌড়ে সর্বাধিক অগ্রগামী হিসেবে পরিচিত ইরানে সম্প্রতি এমন কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটছে যে সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না সেখানে মূলত কী ঘটতে যাচ্ছে•••

বিশ্বে পরমাণু শক্তির অধকারী হওয়ার দৌড়ে সর্বাধিক অগ্রগামী হিসেবে পরিচিত ইরানে সম্প্রতি এমন কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটছে যে সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না সেখানে মূলত কী ঘটতে যাচ্ছে•••


যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাইবার যুদ্ধ কি শুরু?


গত জুলাই ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে একটি ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে যা ইরান সরকার ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছে এবং এর ক্ষয়ক্ষতি যতটুকু সম্ভব কম দেখাতে চেষ্টা করেছে। পরমাণু কেন্দ্রের মত স্পর্শকাতর স্থানে এমন অগ্নিকান্ড ইরানে আজ নতুন নয়, আসুন জেনে নেই আসলে এটি কী ছিল এবং কোন কর্মসূচির অংশ এটি,কারা করেছে•••


এটি ছিল মূলত একটি ভয়ঙ্কর সাইবার হামলা, যার মাধ্যমে একটি পরমাণু স্থাপনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।কিন্তু নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে সাধারণতই অন্যান্য দেশের মত এটিকে ইরান সাইবার হামলা হিসেবে স্বীকার করলেও মূল পরমাণু কেন্দ্রে এর কোন ক্ষতি সাধিত হয়নি বলেছে, তবে ইরান ক্ষোভে শুধু এতটুকু বলেছে যে, যেসব সেন্ট্রিফিউজ এবং যন্ত্রপাতি স্থাপনা নষ্ট হয়েছে, এর চেয়েও শক্তিশালী করে পুনরায় স্থাপনা তৈরি করবে।


এর আগে মে মাসের শেষের দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উপর বড়সড় একটি সাইবার হামলা প্রতিহত করেছিল বলে ইরানি সাইবার সিকিউরিটি জানিয়েছিল।ঠিক এর কয়েকদিন পরেই ইরানের সম্পূর্ণ আমদানি রপ্তানির ৫০ শতাংশই যে বন্দর দিয়ে সম্পাদিত হয়,সেই শহিদ রাজাই বন্দরে সাইবার হামলা চালানো হয়, যার ফলে কয়েক ঘন্টার জন্য বন্দরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
২৬শে জুনও একটি জ্বালানী উৎপাদনের কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটে, ধারণা করা হয় এখান থেকে ইরানের ব্যালস্টিক মিসাইলের জ্বালানী সরবরাহ হতো।



গত এক মাসের এতো ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজর কাড়তে না পারলেও সর্বশেষ পরমাণু স্থাপনার বড় বিস্ফোরণ আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং ইরানকে যথেষ্ট নাড়াচাড়া দিয়েছে।বিভিন্নভাবে এটিও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এসবের পেছনে ইসরায়েলেরই হাত এবং সাহায্যকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ। এমন বিভিন্ন বড় বড় হামলা গত বিশ বছর ধরে ইরানে অনেকবার চালানো হয়েছে এবং চার-পাঁচ বছর পর তা স্বীকার করে নিয়েছে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র।


তবে আগের ইরান আর এখনের ইরান যথেষ্ট পার্থক্য আছে।এতোদিন ইরানের ইন্টেলিজেন্স থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট এবং বিজ্ঞানী মহলেও নারীর লোভ এবং টাকার পাহাড়ের লালসা দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পথভ্রষ্ট করে ইরানের স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টায় নিয়োজিত ছিল ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র।ইরানি সরকার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে নিজেদের কিছুটা শক্ত অবস্থান সৃষ্টির পরে এবার তারাও পথে হাঁটছে, এজেন্ট ছড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল আমেরিকায়।


সর্বশেষ পরমাণু স্থাপনায় হামলার প্রতিশোধ নিতে এর ইন্ধনদাতা যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে গত ১৪ জুলাই আমেরিকার একটি পরমাণু চালিত বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়।এই অগ্নিকান্ডে অর্ধশতাধিক নাবিক আহত হয়েছে, যার মধ্যে ২৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান



এর পরপরই ইরানি শীর্ষ এক জেনারেল বক্তব্যে বলেন, "মার্কিন বাহিনী বিশ্বব্যাপী যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে তারই ফল হলো বিমানবাহী রণতরীতে বিস্ফোরণ।মার্কিন নাগরিকদের উচিত এই বিস্ফোরণের পেছনে কারা আছে তা খুঁজে সময় নষ্ট না করা। এটি এমন এক আগুন যা তাদের নিজেদেরকেই পুড়িয়ে মারবে। আসছে দিনে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে থাকবে এবং ভবিষ্যতে ইসারয়েল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অনেক কিছু অপেক্ষা করছে•••"


তাঁর বক্তব্যের প্রথম কয়েক লাইন রাজনৈতিকভাবে নেয়া গেলেও পরবর্তী কথাগুলো ছিল বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করে নিয়ে প্রচ্ছন্ন হুমকি!
বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে বিস্ফোরণ এমনিতেই লজ্জাজনক, তার উপরে যখন আসে এমন হুশিয়ারি, তখন যুক্তরাষ্ট্র সর্বশক্তি দিয়েই এর জবাব দেবে এবং দিয়ে দিয়েছেই ইতোমধ্যে•••


মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ইরানেও নিজের অবস্থান এবং ক্ষমতা জানান দিয়ে ইসারায়েলের সহায়তায় ১৫ জুন বিকালে ইরানের বুশেহর বন্দরে থাকা সাতটি জাহাজে বিস্ফোরণ যুক্তরাষ্ট্রই ঘটায় বলে ধারণা করা হচ্ছে! হামলা এবং হুমকির ২৪ ঘন্টা পার না হতেই ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সামরিক ঘাঁটির অদূরবর্তী বন্দরে এমন বিস্ফোরণই যেন ইরানের অভ্যন্তরে শত্রুর পেশিশক্তির প্রকাশ ঘটায়।


তবে ইরানি জেনারেলের হুমকিতে বোঝা যাচ্ছে গত বিশ বছর ধরে যেভাবে হামলা এবং একের পর এক পরমাণু বোমার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়া সহ্য করেছে চুপ করে, তা আর এখন হবে না।তারা সম্ভবত একই কায়দায় ইরাসায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে হিসাব বুঝিয়ে দিতে নয়া ছক কষেছে। আর এটা জেনেই পানি সরবরাহ কেন্দ্রের বড় হামলা ভেস্তে যাওয়ার পর ইসরায়েল নিজ দিশে হাই এলার্ট জারি করেছিল ইরানি সাইবার এটাকের আশঙ্কায়।


এছাড়াও সম্প্রতি ইরাকে গত এক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন সামরিক বহরে ভয়ানক হামলা হয়।আল-জাজিরার মতে, প্রথম হামলায় একটি মার্কিন সামরিক বহর উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যেখানে কমপক্ষে তিনটি সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে।দ্বিতীয় হামলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত না হলেও এর পরিমাণ ব্যাপক বলে জানিয়ে হামলাকারী বিদ্রোহী গোষ্ঠী।


এছাড়া কিছুদিন আগে ইরানের নৌ-প্রধান বলেছেন, "ইরান সমুদ্রতীরবর্তী ভুগর্ভে বহু ক্ষেপণাস্ত্র শহর তৈরি করেছে।এসব শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।পারস্য উপসাগর এবং মোকরান উপকূল জুড়ে রয়েছে এসব ভুগর্ভস্থ শহর।পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের সর্বত্র আমাদের অবস্থান রয়েছে, এবং এমন জায়গাতেও আমাদের অবস্থান আছে যা শত্রুরা কখনো কল্পানাও করতে পারেনি। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমরা শত্রুদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিতে পারি।"


বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল এবং আমেরিকা যে সমন্বিতভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি প্রতিরোধ করছে, তার মাইলফলক স্বরূপ ২০১১ সালের জানুয়ারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অবসরে যাওয়ার আগে বলেছিলেন, তাদের যাবতীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ২০১৫ পর্যন্ত ঠেকানো গেছে। এর ফলে ইরানের লাগাম টানতে ২০১৫ সালে ইরানকে পরমাণু চুক্তিতে আবদ্ধ করা হয়।তবে ইরান গোপনে কাজ করে যাচ্ছে বলে ইসরায়েলের লাল সংকেত পাওয়ার পর তা যাচাই বাছাই শেষে আরো কড়াভাবে লাগাম ধরতে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের চুক্তিকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে একা বেরিয়ে যায় এবং সর্বোচ্চ চাপের নীতি প্রণয়ন করে।তবে অনেকের মতে, লাগাম টানার মতো অবস্থায় ইরান এখন আর নেই•••


অনেকের মতে, ইরান ইতোমধ্যেই স্বল্প ক্ষমতার পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে, উত্তর কোরিয়ার মত নিজ দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দেয়ার মত সময় আসেনি বলে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলছেনা; কিংবা ইসরায়েলের গুপ্তনীতি আনুসরণ করছে।


ইরান কখন থেকে কিভাবে পামাণবিক বোমা বানাতে উঠেপড়ে লেগেছে, কিভাবে কয়বার কাদের মাধ্যমে তা বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে, পরমাণু বোমার ফর্মুলা কারা দিয়েছে তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন... 👉  ইরানের পারমাণবিক ইতিহাস


ইরান সম্প্রতি চীনের সাথে বাণিজ্যসহ সামরিক খাতের সহতোগিতার বড় একটি চুক্তি করেছে বলে আমরা জানি, এর পরপরই ভারতকে একটি চুক্তি থেকে তারা ছাটাই করে দিয়েছে।তাছাড়া যে ইরান দীর্ঘসময় যাবত নেতিবাচক অর্থনীতি নিয়েও পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতাবৃদ্ধি ঘটিয়েছে, সেই ইরান এখন ইতিবাচক অর্থনীতি নিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে সাইবার হামলা,বিস্ফোরণ ইত্যাদি আরো পারদর্শীতার সাথে সামাল দেবে এবং ধারাবাহিক জবাবও দেবে বলে আশা করছেন বিশ্লষকরা।


তথ্যসূত্র: মিডলিইস্ট মনিটর, বিবিসি, আল-জাজিরা,আনাদুলু এজেন্সি, এএফপি।

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.