-->

করোনা পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে

2019 এর ডিসেম্বরের পরের বিশ্ব আগের সেই বিশ্ব থাকছে না।1945-এ বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে যে পরিবর্তন এসেছে,তার চেয়েও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বর্তমানের অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মনুষ্য জাতির যুদ্ধের পর।

2019 এর ডিসেম্বরের পরের বিশ্ব আগের সেই বিশ্ব থাকছে না।1945-এ বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে যে পরিবর্তন এসেছে,তার চেয়েও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বর্তমানের অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মনুষ্য জাতির যুদ্ধের পর।

করোনা পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে


বিশ্বের নিরাপদ উন্নত অঞ্চল হিসেবে ক্ষ্যাত আমেরিকা ইউরোপের আক্রান্ত হওয়ার পর অন্তত বিশ্ব মানবতার এই টনক নড়েছে যে,মানবজাতির একাংশকে বিশুদ্ধ পানি নূন্যতম সেনিটেশন থেকে দূরে রেখে একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলকে স্বর্গে পরিণত করা অসম্ভব।আর বিশ্বশনেতাদের এই ভ্রান্ত ধারণার মাশুল স্বরূপ বিশ্বনেতৃত্বে আসতে যাচ্ছে আমূল পরিবর্তন।


বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র এখনো পারেনি বিশ্বকে একটি স্বস্তির বাণী শোনাতে।বরঞ্চ তারা নিজেদের অনেক নাগরিকের টেস্টই সম্পন্ন করতে পারছে না।এছাড়াও দীর্ঘ দিনের বিশ্বস্ত বন্ধু ইউরোপের দেশগুলোতে ভাইরাসের সংক্রমণের খবর শোনামাত্র কোন আলোচনা ছাড়া সীমান্ত থেকে শুরু করে সব বন্ধ করে দেয়া শুরু করে,অথচ এই দেশগুলোই বিভিন্ন সময় অপ্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের কথায় বিশ্বব্যাপী যুদ্ধে লিপ্ত হয়।এসব ঘটনাই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে বিশ্ব মোড়লের আসনে নতুন রাজার আগমনের,যেমনটা দেখা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় "স্প্যানিশ ফ্লু" এর কারণে বিশ্বের লিডিং পজিশনে অস্ট্রিয়া জার্মানির আসনে ফ্রান্স বৃটেনের উঠে আসা।


বিপরীতে দেখুন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোন কোম্পানির আগেই চীনের -কমার্স প্রতিষ্ঠান আলি-বাবা বিশ্বের 54 টি দেশে মাস্ক করোনা নির্ণায়ক কিট পাঠিয়েছে।আপাত দৃষ্টিতে এটি সাহায্য মনে হলেও মূলত একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।হ্যাঁ,বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বলছি না,কারণ এখনকার এই কার্যকলাপ বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানে চীনের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।আর যুক্তরাষ্ট্রের এন্টিবায়োটিকের বাজারের 95 শতাংশ অংশীদারই যেখানে চীন,সেখানে মার্কিনিদের সাহায্য সক্ষমতা কতটুকু তা বোঝাই যায়।ইতোমধ্যেই প্রায় সবাই স্বীকার করছে,করোনা মোকাবেলায় চীন সফল এবং তারা বিশ্বের মডেল।আর চীন এখন ঘর সামলে মোক্ষম সময়ে দোকান সাজাতে ব্যাস্ত।


অপরদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্ব থেকে বেঁচে থাকতে অদূর ভবিষ্যতে তাদের সাপ্লাই চেইনের প্রধান বড় বড় উদ্যোক্তারা কারখানা নিরাপদে সরিয়ে নেবেন।


করোনা পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে
করোনা পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে

পকেটে ডলার-পাউন্ড নিয়ে দ্রব্যাদি না পাওয়ার মত বিরল ঘটনা ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে উত্তর আমেরিকা ইউরোপের মত মহাদেশে;আর এটা যে বিশ্ব পুঁজিবাদেরই নির্মম ফলাফল তা সবাই ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে।এর মাধ্যমে নৈতিকতা ছাড়াও কার্যকরিতার দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হল বিশ্ব-জনস্বাস্থ্য,প্রকৃতি পরিবেশকে বাদ দিয়ে শুধু পুঁজির স্বার্থ দেখার ঐতিহ্য।মানুষের স্বাস্থ্য,পরিবেশকে বাদ দিয়ে যে কারখানার মাধ্যমেই সব সম্ভব নয়,বর্তমান বিশ্বের স্থবির কারখানাগুলো তারই প্রমাণ দিচ্ছে যেন।এর ফলে প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে যে,ভাইরাস মানুষকে আক্রমণ করলো,নাকি পুঁজিবাদী উন্নয়ন চিন্তা মানবজীবনকে বিপদে ফেলে দিলো•••


বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি দেশগুলোর অর্থনীতিতেও আনবে আমূল পরিবর্তন।এক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর প্রধান ভূমিকা দেখা যাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যাদি সেবাখাতে স্বনির্ভর হওয়ার ব্যাপারে।বাড়বে পণ্যের নিট মূল্য।কারণ নতুন উৎপাদন ব্যাবস্থাতে প্রাধান্য দিতে হবে পণ্যের পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যগত মানোন্নয়ন ছাড়াও নতুন অনেক শর্ত।


করোনা পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলোর চলমান আচরণ, রাজনীতি অবরোধ যেন বার্তা দিচ্ছে বিশ্ব সমাজের অসংহতি,নির্মমতা,অদূরদর্শীতা স্বার্থপরতা।দোকানগুলোর শুন্য কোটাই আমাদের এই অমানবিক বিশ্ব পুঁজিবাদী রীতির নৃশংসতার প্রমাণ দিচ্ছে।


ধর্মীয় ক্ষেত্রগুলোতেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।বিশ্বের সব ধর্ম চর্চার প্রধান কেন্দ্রগুলোর বন্ধ হয়ে যাওয়া,পরবর্তীতে ধর্ম পালনের মাঝে সংযুক্ত করবে স্বাস্থ্য সচেতনতা, ধর্মীয় নিয়ম কানুনে আধুনিক বৈশিষ্ট্য।মুসলিম প্রধান দেশগুলো আসন্ন রমজানে বিশাল খাদ্য চাহিদা সার্বিক যোগান কিভাবে সামাল দিবে তা নিয়ে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে জল্পনা কল্পনা।


বিশ্বের 75 টি দেশে সবধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত শিক্ষাকে অনলাইন ভিত্তিক করার ক্ষেত্রে একটি বড় #পুশ_আপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।ইতোমধ্যেই উচ্চ শিক্ষায় বিশ্বের অগ্রজরা অনলাইন কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে।ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে আধুনিকায়ন আগামী দশ/বিশ বছরে হওয়ার কথা,তা হবে মাত্র কয়েক বছরে।


বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় সীমানা বিলুপ্ত করার যে স্লোগান,তাও এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল।এছাড়াও করোনা আরো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল চলমান বিশ্বায়নের দিকে।এই বিশ্বায়ন যে রাজনৈতিক ঐক্যের মুখোশে বাণিজ্যিক স্বার্থ নির্ভর তাই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল করোনা।স্বয়ং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর যে অতিমাত্রার সীমান্ত সতর্কতা,তা- ইইউ(EU) এর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্কে অভিনব পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।এই অভিনব রাষ্ট্রীয় সতর্কতা তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী একটি নতুন টার্ম,যা হলো করোনা-জাতীয়তাবাদ।এটা আগামী দিনগুলোতে সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম পাঠ্য বিষয়ে পরিণত হবে বলে মনে করি।


আর ভাইরাস সংক্রমণ থামার সাথে সাথে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো উৎপাদনে পূর্ণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে জোর দেবে অটোমেশন পদ্ধতির উপর;ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতেই এটা করতে তারা বাধ্য হবে।কারণ মানব শ্রম দিয়ে দ্রুততর যান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।তবে অটোমেশনের এই প্রক্রিয়া ধরে নেয়া যায় শ্রমজীবি মানুষের জীবন অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হওয়ারই প্রক্রিয়া।এর থেকে রেহাই পাবে শুধুমাত্র দক্ষ শ্রমিকেরাই।



আমরা জানি অর্থনীতিতে বাজার বলতে একটি অবস্থা/পরিস্থিতিকে বোঝায়।আর ভবিষ্যতেও আমাদের সামনের সুপারশপ হাট-বাজারগুলো সেই অদৃশ্য বাজারে পরিণত হবে।ঘরের বাইরে যাওয়ার চেয়ে ঘরে বসেই সব করতে আগ্রহী হবে উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা উভয়েই।কাজ হবে ঘরে,বিক্রি হবে অনলাইনে।ফলে যাতায়াতের জটিলতা এবং সময়ের ফায়দা নিতে বর্তমানের অফিস-আউয়ারের চেয়েও বেশি সময় কাজ করবে উৎপাদক,প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে থাকবে সর্বদা সক্রিয়,উৎপাদনে লাগবে কম শ্রমিক।দোকানিদের বাজার -কমার্সে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় অন্যতম #পুশ_আপ পাবে অনলাইন অর্গেনিক ফুডের বাজারও।


আর এর ধারাবাহিকতায় স্থানগত অফিসের ধারণাটিও হ্রাস পাবে।বিশাল অফিস,নথিপত্রের বিশাল স্তুপের দেখা আর না মিলতে পারে।বড় বা ছোট মিটিঙে কর্মীদের নিয়ে আর বসা হবে না,সব ধরণের যোগাযোগ এবং মিটিঙ হয়ে যাবে ডিজিটালাইজড।অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো এতদিন সংস্কৃতিগত কারণে ডিজিটালাইজেশনে ধীরে অংশীদার হলেও এবার তারা এর সাথে দ্রুততার সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হবে।


মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।যেখানে রাষ্ট্রগুলো এতদিন প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিতো,সেখানে নতুন পদক্ষেপ আসবে স্বাস্থ্য সচেতনতায়।মানুষ খাদ্য গ্রহণে ভিটামিনযুক্ত বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে গুরুত্ব বেশি দিবে।করোনা শেষে মানুষের যে লাইফস্টাইলে শারিরীক যে পরিবর্তন আসবে,তার মধ্যে অন্যতম হলো #শূচিবায়ু।মানুষ চলাফেরায় এবং বাহ্যিক আচরণে যথেষ্ট রক্ষণশীল হয়ে পড়বে।
বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে,তাতে এখন সবার মনে একটাই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে,একটি মিসাইল তৈরি না করে একজন ডাক্তার তৈরিটাই রাষ্ট্রের জন্য বেশি প্রয়োজনীয়।


সর্বশেষ পরিবর্তন দেখবো সরকারি ব্যাবস্থাপনায়; জনসাধারণের জিবনে কতটা হস্তক্ষেপ করবে তারা করবে সে ক্ষেত্রে।ইতোমধ্যেই দেখছি আমরা কী খাব,কী পরিধান করব,কোথায় কখন যেতে পারব,সবকিছু সরকারগুলোই নিয়ন্ত্রণ করছে ভাইরাস সংক্রমণের অজুহাতে।তবে কথা হলো সংক্রমণ কমার পর এই হস্তক্ষেপ কমবে তো?মোটেও না।কেউ সুযোগ একবার হাতে পেলে তা সহজে ছাড়ে না,ফলে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের সফল বাস্তবায়ন তো দূরে থাক,সরকারগুলো হয়ে উঠবে কর্তৃত্ববাদি।সরকার নিরাপদ সমাজের অজুহাতে জনগণের সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে হাত ধোয়া পর্যন্ত অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করবে।


জানিনা কখন এই মৃত্যুর মিছিল থামবে,কখন মানুষ মুখোশ খুলে নির্ভয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবে,একে অপরকে আলিঙ্গন করবে।এই পরিস্থিতি চলতে পারে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত,তারপর মানুষ উঠে দাড়াবে নতুন অভিজ্ঞতায় অভিনব জীবন পদ্ধতির মাধ্যমে।কারণ প্রতিটি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পর এমনই হয়েছে•••


পরিশেষে এটি বোঝা যায় যে,আগামী দিনে বিশ্ব কতটা প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়বে।উৎপাদন ব্যাবস্থা দ্রুততার সাথে অটোমেশন,রোবটিক্স,এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।ফলে আমাদের এখন আর প্রযুক্তি বিমুখ থাকার উপায় নেই,অফিস এপ্লিক্যাশন ছাড়াও জানতে হবে কম্পিউটার সায়েন্স,আর্টিফিসিয়ার ইন্টেলিজেন্সের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে।সুতরাং এখন থেকেই যদি বাংলাদেশের যুবসমাজ সচেতন হয়ে প্রযুক্তি দক্ষতা না বাড়ায়,তাহলে আমরাই হব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রথম শিকার•••

GET READY GUYS...

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.