-->

সিরিয়ার পারমাণবিক ইতিহাস

আজ আমরা যে যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সিরিয়াকে দেখছি,তার অতিত কেমন ছিল?তাদের সামরিক সক্ষমতা কেমন ছিল এবং তারা কি কখনো ইরানের মতো পরমাণু বোমা বানাতে চেয়েছিল?

আজ আমরা যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া যে সিরিয়াকে দেখছি, তার অতিত কেমন ছিল? তাদের সামরিক সক্ষমতা কেমন ছিল এবং তারা কি কখনো ইরানের মতো পরমাণু বোমা বানাতে চেয়েছিল? আসুন জেনে নেই...

সিরিয়ার পারমাণবিক ইতিহাস


আজ আমরা যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া  যে সিরিয়াকে দেখছি,তার অতিত কেমন ছিলতাদের সামরিক সক্ষমতা কেমন ছিল এবং তারা কি কখনো ইরানের মতো পরমাণু বোমা বানাতে চেয়েছিলআসুন জেনে নেই•••


গৃহযুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ছিল ইসরায়েলের অন্যতম সক্ষম শত্রু সিরিয়ার ছিল সাধারণ অস্ত্রের ভান্ডারের পাশাপাশি বায়োলজিক্যাল অস্ত্র,যা গৃহযুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বিদ্রোহীদের ওপর সরকারী বাহিনী প্রয়োগ করেছিল।এছাড়া সিরিয়ার ইতিহাসে মিশর,সৌদির মতো ইসরায়েলের সাথে হাত মেলানোর কোন রেকর্ড নেই।তারা সর্বদাই চড়া গলায় ইসরায়েলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছে,পাল্টা হামলা করেছে,এবং ইসরায়েলের সাথে টেক্কা দিতে তারাও কয়েক দশক আগে পরমাণু বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল,কিন্তু সেই কর্মসূচির কী হলো?কখন কিভাবে কার মাধ্যমে কোথায় এই মরণাস্ত্র তৈরি করতে চেষ্টা করেছিল,চলুন ইতিহাসের পাতা উল্টাই•••


  • ২০০৭ সালে লন্ডনে সিরিয়ান এক সিনিয়র অফিসারের লেপটপ থেকে ইসরায়েল প্রথম নিশ্চিত হতে পারে সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে।তথ্যাদি থেকে দেখা গেল সিরিয়া সরকার মরুভূমির প্রত্যন্ত এলাকায় পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপন চুড়ান্ত করেছে।উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের ছবি তথ্য লেপটপে ছিল।আরও ছিল উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান সিরিয়ান পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান ইব্রাহিম ওথামের ছবি।

কিছুদিনের মধ্যে তথ্য যাচাই বাছাই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েল নিশ্চিত হলো যে সিরিয়ার সরকার প্রচন্ড গোপনীয়তার সাথে মরুভূমির দির আল জুর এলাকায় পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তথ্যাদি ঘেঁটে আশ্চর্যের বিষয় যা পাওয়া গেল তা হলো এই; পরমাণু কার্যক্রমের পরিকল্পনাকারী উত্তর কোরিয়া এবং এর পেছনে অর্থ ঢালছে ইরান।



  • ১৯৯০ সাল থেকেই সিরিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক।সিরিয়া সফরকালে তৎকালীন কোরিয়ান প্রধানমন্ত্রী কিম উলসুং সিরিয়ার সাথে কিছু সহযোগিতাপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন;যার একটি ছিল সামরিক কারিগরি সহায়তা বিষয়ক।তাদের বৈঠকে পারমাণবিক ইস্যু প্রাধান্য পেলেও এর আগে রাসায়নিক বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের প্রতি ছিল প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের জোর।

এর ভিত্তিতে ১৯৯১ সালে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের সময়কালে উত্তর কোরিয়ার স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান সিরিয়া পৌঁছায়।

  • ২০০০ সালে হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর বর্তমান বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় বসেন এবং উত্তর কোরিয়ার সাথে একটি বৈঠক করেন।2002 সালের জুলাইয়ে সিরিয়ার দামেস্কে সিরিয়ার সিনিয়র কর্মকর্তা,উত্তর কোরিয়া ইরানের একটি গোপন বৈঠক হয়।বৈঠকে স্বাক্ষর হয় একটি ত্রিপক্ষিয় চুক্তি এবং প্রকল্প ব্যায় ধরা হয় দুই বিলিয়ন ডলার।

পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়া থেকে কেন্দ্র স্থাপনের কাজে বিশাল কার্গো জাহাজে মালামাল আনা শুরু হয়,২০০৫ এবং ২০০৬ সালে সন্দেহজনক মালামালসহ আন্তর্জাতিক জলসীমায় কয়েকটি জাহাজ আটক হয়,কয়েকটি ডুবে যায়,এভাবেই তথ্যাদি ইসরায়েল মেলাতে থাকে।

  • ২০০৬ সালে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের সিরিয়া সফরের কথাও গোয়েন্দা মহলে প্রকাশ হয়,কিন্তু দির আল জুর পারমাণবিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে সিরিয়া ছিল অতিমাত্রায় সতর্ক।প্রকল্প এলাকায় সকল রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়া হয়,প্রকল্পে কর্মরত সকল কর্মকর্তার মোবাইল ফোন স্যাটেলাইট কর্মকান্ড ছিল নিষিদ্ধ।সেই কেন্দ্রের ব্যাপারে স্পেস থেকেও বিশ্ব সম্প্রদায় কিছু চিহ্নিত করতে সক্ষম হল না।

  • ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী আলি রেজা আসগরী নামক এক ইরানি জেনারেল সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্বপক্ষ ত্যাগ করে সিআইএ' সাথে হাত মেলায় এবং বিপুল তথ্য তাদের সরবরাহ করে।তিনি ইরান সিরিয়ায় চলমান পরমাণু কেন্দ্রের বিস্তারিত তথ্যাদি সরবরাহ করলেন এবং আরো জানালেন যে, সিরিয়ার দির আল জুরের পারমাণবিক কেন্দ্রে যে শুধু ইরান টাকা ঢালছে তা নয়,বরং প্রকল্পটি যাতে দ্রুত শেষ হয়,সেই লক্ষ্যেও কাজ করছে তারা।এছাড়াও এসবে উত্তর কোরিয়ার যোগসাজশ জড়িত তিন দেশের কর্মকর্তাদের নাম-ধামও সিআইএকে আসগরী সরবরাহ করলেন।

উল্লেখ্য আসগরীর এই তথ্যাদি সরবরাহ করার 5 মাস পরেই পুর্বল্লোখিত লন্ডন থেকে সিরিয়ান অফিসারের লেপটপ হস্তগত হয় ইসরায়েলের।

এমন তথ্যে ইসরায়েলের বুক কেঁপে উঠে।তাৎক্ষণিক তারা দেশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাসহ প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে সার্বিক আলোচনা করে এবং এই সম্পর্কে ইসরায়েলের পদক্ষেপ নির্ধারণ হল।সিদ্ধান্ত হলো শেষবারের মতো নিজস্ব মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হবে।

  • একটি বোল্ড অপারেশনের আন্ডারে গোয়ান্দা সদস্যরা সিরিয়ান এক বিজ্ঞানীকে দিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে পরমাণু কেন্দ্রের ছবি তুলে পাঠান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে।শত যুক্তি চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্যাটেলাইট পরমাণু কেন্দ্রের ওপর স্থির করল।
  • অতঃপর উভয় দেশ নিশ্চিত হলো যে সিরিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিপজ্জনকভাবে পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের কাজ করছে।
সিরিয়ার পারমাণবিক ইতিহাস
সিরিয়ার পারমাণবিক ইতিহাস

  • ২০০৭ এর আগস্টে ইসরায়েল নিশ্চিত হয় পরমাণু কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের জন্যেই।তারা সায়েরেত মাটকাল নামের একটি এলিট কমান্ডো ফোর্স পাঠায় সিরিয়ায়।তারা সরাসরি কেন্দ্রের পাশ থেকে মাটি তুলে আনে,যা পরীক্ষায় অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তার প্রমাণ পায় ইসরায়েলি বিজ্ঞানীরা।

  • পরিশেষে সিরিয়া আক্রমণের তারিখ নির্ধারিত হয় ২০০৭ এর সেপ্টেম্বর মধ্যরাত।ইসরায়েলের কিং ফিশার নামক একটি এলিট কমান্ডো ফোর্স সিরিয়ান আর্মির পোশাকে পরমাণু কেন্দ্রের পাশে অবস্থান নেয়।দীর্ঘ ২৪ ঘন্টা তারা কেন্দ্রের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলো এবং রিপোর্ট করতে থাকলো।৫ তারিখ রাত এগারোটায় টি জেট ফাইটার প্রস্তুত করল ইসরায়েল।ফাইটারগুলোকে সময় দেয়া হয় ৩০ মিনিট।তুরস্ক সিরিয়ার সিমান্ত ধরে এগিয়ে পরবর্তীতে পরমাণু কেন্দ্রের পাশে নির্ধারিত দুরত্বে অবস্থান নেয় জেটগুলো।সাতটি ফাইটার একসাথে বোমা ছুঁড়ল,আধা টন ওজনের বোমার আঘাতে সিরিয়ার ইসরায়েলকে ধ্বংস করার স্বপ্নের যবনিকাপাত হল।হামলা শেষে সময়ের আগেই বিমানগুলো ঘাঁটিতে ফিরে এল।


পরদিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পাল্টা হামলার ভয়ে শিঘ্রই তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন।তাঁর মাধ্যমে সিরিয়াকে জানালেন যে,যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা তার নেই,কিন্তু দ্বারপ্রান্তে পারমাণবিক অস্ত্র হবে এটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না তাই এই পদক্ষেপ।



রিয়েকশনে সিরিয়াকে দেখা গেল একদম নিশ্চুপ,হামলার ব্যাপারে তারা একটি ব্রিফে জানালো ইসরায়েলি কিছু বিমান রাতে অনুপ্রবেশ করেছিল সিরিয়ার আকাশ সীমায়,কিন্তু সিরিয়ান বাহিনী তাদের ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।


সিরিয়ার এমন আচরণের কারণ হলো এটি ছিল গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি,যদি এটি স্বীকার করে তারা,তবে নিজেদের অসাবধানতা ইসরায়েলের তুলনায় তাদের সম্মান মাটিতে মিশে যাবে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অবরোধ জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হবে।


সর্বশেষ সিরিয়ার পরমাণু স্বপ্নকে স্তিমিত করা হয় সিরিয়ান জেনারেল মোহাম্মদ সুলাইমানকে হত্যার মাধ্যমে।এই জেনারেল ছিলেন আসাদের ঘনিষ্ট উপদেষ্টা সিরিয়ার সামরিক এবং প্রতিরক্ষা তত্ত্বাবধায়ক।সবচেয়ে বড় কারণলো তিনিই ছিলেন পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা।দির আল জুর পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংসের পর নতুন কেন্দ্র তৈরি করার সাহস সক্ষমতা ছিল একমাত্র এই ব্যাক্তিরই।কথিত আছে তিনি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পরিকল্পনাও করেছিলেন ব্যাক্তিগতভাবে,তবে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন তিনি।কিন্তু হামলার এক বছর না জেতেই এই জেনারেলকে ২০০৮ সালে হত্যার মাধ্যমে সিরিয়ার পারমাণু কর্মসূচির দ্বার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়•••
(তথ্যসূত্র:-ইসরায়েলি গোয়েন্দা জোহার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মহাপরিচালক মিশাল।)



এরপর সেই ধাক্কা সামাল দিয়ে ইরানের মতো পুনরায় কর্মসূচি শুরুর সেই প্রয়াস সিরিয়া সরকার আর পায়নি।বছর কয়েক না যেতেই ইসরায়েল বিদ্রোহ ঘটালো,সুযোগ সন্ধানী শক্তিগুলো হস্তক্ষেপের অজুহাতে সিরিয়াকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করল।এই গৃহযুদ্ধের মাঝেই ইসরায়েল রকেট হামলা চালিয়ে সিরিয়ার পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র ধ্বংস করল,ঐতিহাসিক স্থাপনা বিভিন্ন গবেষণাগারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল,আর বিশ্বে রাসায়নিক অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান দেখিয়ে সিরিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বিশ্ব দরবারে মাটিতে নামিয়ে আনল।এই ধ্বংসযজ্ঞে ইসরায়েলকে অভ্যন্তরীণ সাহায্য তথ্য দেয় এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে উত্তাল করে তোলে ইসরায়েলের সৃষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস।


এই গৃহযুদ্ধে সিরিয়া যা হারিয়েছে,তা আরো বিশ বছরেও অর্জন করতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।আর এভাবেই শেষ হলো মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সুখী সমৃদ্ধ দেশের ধ্বংসযজ্ঞ•••

🔛ইরানের পারমাণবিক ইতিহাস

ANALYSING THE WORLD

Author & Editor

International Political Analyst and Content Writer.

0 comments:

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.